ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শাহ্‌নগরে চারার হাসি

শাহ্‌নগরে চারার হাসি
×

নার্সারিতে উৎপাদিত চারা তুলছেন কয়েকজন শ্রমিক। সম্প্রতি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার শাহ্‌নগর এলাকায় সমকাল

এস এম কাওসার ও শাহনেওয়াজ শাওন, বগুড়া  

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪১

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার শাহ্‌নগর এলাকার কৃষকরা তিন দশক আগেও আউশ ও আমন ধান ছাড়া অন্য ফসল আবাদ করতেন না। বছরের ছয় মাসে ধানের আবাদ ছাড়া বাকি সময় কৃষিজমি পতিত পড়ে থাকত। কৃষকরা এই সময়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন। গত দুই দশকের মধ্যে চিত্র পাল্টে গেছে। সেখানে ঘটেছে বিভিন্ন ফসলের চারা উৎপাদনের নীরব বিপ্লব। চাকরির পেছনে না ছুটে এলাকার অনেক যুবক যুক্ত হয়েছেন কৃষিতে। শাহ্‌নগরে উৎপাদিত সবজির চারা বগুড়ার সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে অন্তত ৩২টি জেলায়। বছরের তিন মাসে সবজির চারা উৎপাদনের বাজার গড়ে উঠেছে অন্তত সাড়ে ৭ কোটি টাকার, যা বদলে দিয়েছে এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র। 

যেভাবে শুরু হলো 
শাহ্‌নগর গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন অন্য ফসল চাষাবাদের পাশাপাশি ১৯৯৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ১০ শতক জমি দুই ভাগ করে ফুলকপি ও মরিচের বীজ বপন করেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে বীজ বপনের পর চারা গজালে পরিচর্যা করে বেশ বড় করেন। সেই চারা রোপণ করে ভালো ফসল পান। এরপর তিনি প্রতিবছর চারা উৎপাদন করে নিজ জমিতে শীতকালীন সবজির চাষাবাদ করতে থাকেন। তাঁর দেখাদেখি এলাকার অন্য কৃষকরাও ধানের পাশাপাশি সবজির চাষাবাদ শুরু করেন। এর মধ্যে কৃষকরা আমজাদের কাছ থেকেই চারা নিতেন। ফলে চাহিদা বাড়ায় আমজাদ হোসেন গড়ে তোলেন আঁখি বীজ অ্যান্ড নার্সারি। ২০০২ সালের পর থেকে আমজাদের দেখাদেখি এলাকায় প্রায় অর্ধশত সবজির নার্সারি গড়ে ওঠে। এখন সেখানে নার্সারির সংখ্যা আড়াইশ ছাড়িয়েছে। সাধারণত আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাস সবজির চারা উৎপাদনের সময়। 
আমজাদ হোসেন বলেন, আমি যুবক বয়সে আশির দশক থেকে কৃষিকাজ করে আসছি। কিন্তু দেখলাম আমাদের কৃষির মধ্যে বৈচিত্র্য নেই। শুধু ধান চাষের মধ্যে কৃষকরা সীমাবদ্ধ। আমি তখন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের জন্য বীজ বপন করলাম। প্রথমবারেই বেশ ভালো ফলন হলো, স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। সেখান থেকে ধীরে ধীরে কৃষকদের মধ্যে চারা উৎপাদন ছড়িয়ে যায়। 
তিনি আরও বলেন, এখান থেকে যারা চারা নেন, তাদের ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় না। কারণ কোনো নার্সারির নিবন্ধন নেই। তাতে করে ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এখানকার নার্সারিগুলোকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা প্রয়োজন। 

যেসব গ্রামে চাষাবাদ চলছে
শাজাহানপুর উপজেলায় শাহ্‌নগর সবজি চাষের সুতিকাগার হলেও এখন আরও তিনটি গ্রামের অন্তত ২৭০ জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করছেন। গ্রামগুলো হলো কামারপাড়া, বড় পাথার ও খোট্টাপাড়া। ওই এলাকাগুলোয় এ সময় গেলে দেখা যাবে, ফসলের মাঠে শুধু পলিথিনে মোড়ানো চারার প্লট। বিভিন্ন 
এলাকা থেকে চারা নিতে আসা চাষী ও ব্যাপারীদেরও দেখা মিলবে। 
কৃষকরা জানান, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন ও টমেটোর চারাই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করেন। মরিচের চারা আছে সাত-আট জাতের। যেমন– বিজলি, বগুড়া কিং, কারিশমা, টাইগার, কিসমত, সুলতান, লাইলা ও লাইট মাস্টার। ফুলকপির মধ্যে আছে শিলাজাত, কুসুমজাত, নারিশজাত। বাঁধাকপিও একই জাতের। বেগুনের চারা হয় আলতামাস, 
মেন্টাল বোম্বাই ও কালিয়া জাতের। টমেটোও আছে নানা জাতের। 

কেন অন্য জেলার কৃষকরা চারা নেন
কৃষকরা জানান, শাহ্‌নগরসহ এলাকার সবজির চারার মান ভালো। ফসল ও গাছের আকার আকার বড় হয়। এ ছাড়া এখানকার চারার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। বিশেষ করে, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, গাইবান্ধা, রংপুর, নওগাঁ, নাটোর, টাঙ্গাইল, শেরপুর, কুষ্টিয়া, জামালপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কিশোরগঞ্জ জেলার কৃষকরা এখান থেকে চারা নেন।
সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের সোনামুখী এলাকা থেকে ফুলকপির চারা নিতে এসেছিলেন কৃষক মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, লেখাপড়া করেছি এইচএসসি পর্যন্ত। এখন কৃষিকাজ করছি। নিজের জমিতে চাষাবাদ করি। শাহ্‌নগর থেকে ছয় বছর ধরে চারা নিয়ে শীতকালীন সবজির চাষাবাদ করে লাভবান হচ্ছি। 

পাইকাররা কী বলেন
টাঙ্গাইলের করোটিয়া উপজেলার ক্ষুদিরামপুর এলাকার সবজি চারার ব্যাপারী আব্দুল কুদ্দুস। তিনি আট বছর আগে থেকে এ এলাকা থেকে চারা নিয়ে বিক্রি করেন নিজ এলাকায়। তিনি বলেন, আমার এলাকার কৃষকরা 
এখানকার চারার অপেক্ষায় থাকেন। ব্যবসা করে ভালোই লাভ হয়।
এখানকার সবজির চারা চট্টগ্রাম জেলাতেও যায়। কার্টনে বিশেষ কায়দায় প্যাকেট করে রাতের কোচে পাঠানো হয়। উদ্যোক্তারা জানান, চারা দুই থেকে তিন দিন রাখা যায়। নষ্ট হয় না। কুরিয়ারযোগেও চারা পাঠানো হয়।

উৎপাদনের পরিমাণ ও বেচাকেনা
শাজাহানপুর কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে আগাম জাতের এবং উপযুক্ত মৌসুম সময়ে সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। চারা 
উৎপাদনের পরিমাণ সব মিলিয়ে তিন মাসে প্রায় ৩৫ কোটি। বেচাকেনা হয় আগাম জাতের মরিচের চারা প্রতি হাজার ১৫০০ টাকা। ফুলকপির ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। বাঁধাকপিরও একই দাম। বেগুনের চারা এক হাজার টাকা ও টমেটোর চারা ১৫০০ টাকা। বীজ থেকে চারা গজানো এবং বিক্রির উপযোগী করে তুলতে সময় লাগে ৪০ দিন। আগাম জাতের চারা অতিবৃষ্টির কারণে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। তাই দামও বেশি। অন্য সময় এই চারা প্রতি হাজার মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। আগাম জাতের চারা এবার টিকেছে মাত্র গড়ে দুই কোটি। সব মিলিয়ে সেখানে চারা বিক্রি হয় গড়ে সাড়ে ৭ কোটি টাকার। 

বীজ ও কীটনাশক কোম্পানি
জানা গেছে, বগুড়ায় চারা উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ায় শাজাহানপুরে বিভিন্ন বীজ ও কীটনাশক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে কৃষকরা বলছেন, তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই ভালো মানের বীজ নেন। কীটনাশকের ক্ষেত্রেও তাই। এক কেজি মরিচের বীজ বিক্রি হয় কমপক্ষে ৭০ হাজার টাকা। কপির বীজ এক লাখ ৪০ হাজার টাকা, বেগুনের বীজ এক লাখ ২০ হাজার টাকা ও টমেটোর বীজ একই দামে বিক্রি হয়। বীজ নিয়ে কৃষক যাতে প্রতারিত না হন, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রদর্শনী প্লট কৃষকদের দেখান। 
একটি বীজ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বলেন, শাজাহানপুরের উদ্যোক্তা কৃষকরা এতটাই সচেতন যে ১০০টি বীজ নিলে অন্তত পক্ষে ৯৫টি চারা গজাতে হবে। তবেই তারা বীজ নেন, নয়তো নয়। যদি কোনো কারণে ৯০টি গজায়, তাহলে কৃষকদের লাভ হয় না। 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনা খাতুন বলেন, এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় অন্য ৩০-৩২টি জেলা থেকে কৃষক ও ব্যাপারী এসে চারা নিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের সার্বক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঝেমধ্যে কৃষকের ক্ষতি হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সোহেল শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, চারার বাজার বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 
নার্সারিগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×