ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বছরের অধিকাংশ সময় পৌর শহরে পানিবন্দি জীবন

বছরের অধিকাংশ সময় পৌর শহরে পানিবন্দি জীবন
×

জামালপুর পৌর শহরের হাটচন্দ্রা এলাকায় জলাবদ্ধতা সমকাল

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫১

জামালপুর পৌরসভার অন্তত ১০টি এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। ওইসব এলাকার বাসিন্দাদের পানিবন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বর্ষার পুরো সময় হাঁটু কিংবা কোমর সমান পানি পেরিয়ে যাতায়াত করতে হয়। শুকনো মৌসুমেও পুরোপুরি মুক্তি মেলে না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, চার-পাঁচ বছর আগেও এমন দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিত না। বর্ষাকালে কিছুটা পানি জমলেও কয়েক দিনের মধ্যে সরে যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-জলাশয় ভরাট এবং ড্রেন নির্মাণে অব্যবস্থাপনার কারণে জলাবদ্ধতা বছরের অধিকাংশ সময় স্থায়ী হয়ে পড়েছে। আগে যে খাল বা ছোট নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো, তা দখল আর ভরাটের কারণে কার্যত মৃতপ্রায়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে পানি ওঠে।

গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পৌর শহরের হাটচন্দ্রা, পলাশগড়, শেখেরভিটা, বিজয় চত্বর, দাপুনিয়া, বিসিক, বনপাড়া, পৌর গোরস্তান, জুগিরগোপা, বামুনপাড়া, নাঙ্গলজোড়া, পাঁচরাস্তা, পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্তান এলাকা, কাচারিপাড়া ও নাঙ্গলজোড়া। বছরের অধিকাংশ সময় এসব এলাকায় পানি জমে থাকে।

ভুক্তভোগীরা জানায়, পানিবন্দি পরিস্থিতিতে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় নারী ও শিশুদের। প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠানো এখন একপ্রকার যুদ্ধ। স্কুলগামী শিশুরা কাদাপানি মাড়িয়ে ভিজে ভিজে ক্লাসে যায়। অনেক সময় অভিভাবকরাও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। ঘরের ভেতর পানি ঢোকার কারণে রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, এমনকি টয়লেট ব্যবহারে সমস্যার মুখোমুখি হন। গৃহিণীরা অভিযোগ করেন, রান্নাঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পলাশতলা এলাকার গৃহিণী শাহিনা আক্তার বলেন, ‘বছরের বেশির ভাগ সময় পানি মাড়িয়ে চলাচল করি। এমন অবস্থা হয়েছে যে, ঘরে পানি ঢোকায় রান্নাবান্নাও করা যায় না। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো কষ্টকর। প্রতিদিন কাদাপানি মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়।’

এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারের প্রবেশপথ ডুবে থাকায় ক্রেতারা আসতে চান না। দোকানের সামনে প্রায় সবসময় পানি জমে থাকে। ক্রেতা সমাগম কম থাকায় আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা।
হাটচন্দ্রা গ্রামের ব্যবসায়ী রাসেল মিয়া বলেন, দেড়শ বছরের পুরোনো পৌরসভায় এখনও পৌঁছায়নি ন্যূনতম নাগরিক সেবা। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। তাঁর দোকানের সামনে প্রায় সবসময় পানি জমে থাকে। ক্রেতা আসতে চায় না, ব্যবসায় মার খাচ্ছেন তিনি।

নোংরা ও দূষিত পানিতে হাঁটাহাঁটির কারণে অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ, জন্ডিসসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকটও প্রকট। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নোংরা পানি ব্যবহার করছে। একইভাবে দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। বাধ্য হয়ে অনেকে কাজের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন।

পানিবন্দি বাসিন্দারা জানান, চার বছর ধরে এই অবস্থা অব্যাহত থাকায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের আয়োজন, মিলাদ মাহফিল কিংবা মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়া পর্যন্ত ব্যাহত হয় পানিবন্দি পরিস্থিতির কারণে।

মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিমের ভাষ্য, বছরের বেশির ভাগ সময় এসব এলাকার মানুষকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার মধ্যে কাটাতে হয়। কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্তান পানিতে ডুবে থাকায় লাশ দাফন করতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। রেললাইনের দুই পাশ অবৈধভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্বল্পতা, পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ করায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
পৌর প্রশাসক এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ জানান, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণেই এই জলাবদ্ধতা। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘ ও মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক হাসিনা বেগম বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে বাজেট প্রণয়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। আশা করছি, দ্রুত ইতিবাচক সাড়া মিলবে।’

আরও পড়ুন

×