ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানীর ছোট ভাই চাকরি পেলেন বিজিবিতে

বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানীর ছোট ভাই চাকরি পেলেন বিজিবিতে
×

সীমান্ত হত্যার শিকার ফেলানী খাতুনের ছোট ভাই আরফান হোসেন। ছবি: সমকাল

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৮:৫০

দেশে ও দেশের বাইরে আলোচিত সীমান্ত হত্যার শিকার ফেলানী খাতুনের ছোট ভাই আরফান হোসেন (২০) বিজিবির সদস্য হয়ে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছেন। 

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত নিয়োগপত্র তার হাতে তুলে দেন। এ সময় ফেলানীর বাবা নূর ইসলামসহ ১৫ বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৫ বিজিবির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন তিনি। 

ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার বিচার এখনো পাইনি। আমার ছেলে যোগ্যতার প্রমাণ রেখে বিজিবির সিপাহী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন।  বিজিবি আমাকে একটি মুদি দোকান করে দিয়েছেন। সেই দোকানের আয় দিয়ে সাত সদস্যের সংসার চলছে। এ সময় মেয়ের হত্যার বীভৎস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

নুর ইসলাম জানান, ২০১১ সালে ৭ জানুয়ারি ১৪ বছরের মেয়ে ফেলানী খাতুনকে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলেন। দেশে ফিরে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল ফেলানীর। ৮ জানুয়ারি পার্শ্ববর্তী জেলা লালমনিরহাটের কুলাঘাট ইউনিয়নের আমজাদ হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ের কথা ছিল। ঘটনার দিন ভোরবেলায় সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার টপকে যান ফেলানীর বাবা। বাবার পরে টপকাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন ফেলানী। এতে কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে মৃত্যু হয় তার। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে থাকে ফেলানীর লাশ। সেই ঘটনার পর থেকে বিজিবি ফেলানীর পরিবারের পাশে ছিল বলেও জানান তিনি।

কাঁটাতারে ঝুলছে বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানী লাশ। ফাইল ছবি

ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন বলেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য বিজিবির সদস্যের মতো তিনিও দেশের সীমান্ত রক্ষায় কাজ করবেন।  বড় বোন ফেলানী যখন মারা যান; তখন তিনি ছোট। সেদিনের ঘটনা সেভাবে বলতে পারেন না। মায়ের সাথে আসামের বঙ্গাইগাঁও গ্রামে তখন তারা থাকতো।

সীমান্ত রক্ষার কাজে ছেলের চাকরি হওয়ায় খুশি ফেলানীর মা জাহানারা বেগম। তিনি বিজিবিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বাহে, আমৃত্যু ফেলানী হত্যার বিচার হামরা চাইয়া যামু। এটা মানি (মেনে) নেওয়া যায় না। ছাওয়াটা (মেয়েটা) বিয়ের সাজ নিয়ে রওনা হয়েছিল। আর ওমরা (ওরা) পাখির মতো গুলি করে ফেলানীক মারি (মেরে) ফেলল।’ 

লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম সমকালকে বলেন, নিজ যোগ্যতা বলে প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন ফেলানীর ছোট ভাই। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর নিথর দেহ ঝুলার দৃশ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আরফান হোসেনের মনোজগতে পরিবর্তন হতে পারে বিবেচনায় তাকে বাড়তি মানসিক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সবদিক বিচার বিশ্লেষণ করেই তাকে বিজিবির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।  

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন কিশোরী ফেলানী খাতুন। বিএসএফ ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ফেলানীর লাশ কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। সেই ছবি দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সমালোচনার ঝড় উঠে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৩ সালের আগস্টে ভারতের জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস আদালতে বিচার শুরু হয়। মূল অভিযুক্ত অমিও ঘোষ সেই আদালত থেকে খালাসপ্রাপ্ত হন। পরে ২০১৪ সালে নতুন করে বিচার শুরু হলে অমিও ঘোষ মামলা থেকে আবারও খালাস পান। একই বছরে ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানির বাবার পক্ষ হয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন করেন। সর্বশেষ ২০২০ সালে ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য থাকলেও পরে তা পিছিয়ে যায়। মামলার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ফেলানীর পরিবারকে।

আরও পড়ুন

×