ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এগারসিন্দুর প্রভাতী ট্রেনের একই টিকিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি

অনলাইনেও বেড়েছে টিকিট কালোবাজারি

এগারসিন্দুর প্রভাতী ট্রেনের একই টিকিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি
×

.

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:২৭ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৫৯

আসন একটি। কিন্তু টিকিট বিক্রি হয়েছে দুজনের কাছে। একজনের কাছে আছে অনলাইন কপি। আরেকজন নিয়ে এসেছেন প্রিন্ট কপি। এ নিয়ে বেধে যায় তর্কাতর্কি। শেষে প্রিন্ট কপি নিয়ে আসা যাত্রীর কাছে আসন ছেড়ে দিতে বাধ্য হন অনলাইন কপি দেখানো ব্যক্তি। শনিবার সকালে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর এগারসিন্দুর প্রভাতী ট্রেনে এই দৃশ্য দেখা যায়।

কিশোরগঞ্জ স্টেশন থেকে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের মধ্যে যারা কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কেনেন, তাদের প্রায়ই এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতিটি টিকিট দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে কিনেও দেখা যায়, একই আসন কয়েকজনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে গন্তব্যের পুরো পথটি দাঁড়িয়ে যেতে হয়। শনিবার এমন বিপাকে পড়েন শহরের গাইটাল এলাকার ব্যবসায়ী মাসুদ রানা। তিনি শুক্রবার ঢাকাগামী শোভন চেয়ার টিকিট এক কালোবাজারির কাছ থেকে কেনেন ৩০০ টাকায়। যদিও ওই টিকিটের সরকারি মূল্য ১৬০ টাকা।

মাসুদ রানা জানান, ওই কালোবাজারি তাকে কোনো প্রিন্ট কপি দেননি। অনলাইনের একটি কপি মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দেন। সেখানে গ-২৮, গ-৩৭, গ-৪০ ও গ-৪২ নম্বরের চারটি আসনের টিকিট একসঙ্গে ছিল। ওই কালোবাজারি তাকে গ-৩৭ নম্বর আসনে বসতে বলেন। সে অনুযায়ী ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই (৬টা ৩০ মিনিট) তিনি নির্ধারিত আসনে বসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেক যাত্রী এসে দাবি করেন, ওই আসনটি তার। তিনি টিকিটের প্রিন্ট করা কপি দেখান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ তর্কাতর্কির পর হাল ছেড়ে দেন রানা।

সেখান থেকে একই টিকিটের অন্যান্য আসনে গিয়ে বসার চেষ্টা করেন মাসুদ রানা। গ-২৮ নম্বর আসনে বসেছিলেন ঢাকাগামী তরুণী ফারিহা। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ৩০০ টাকা দিয়ে ওই আসনের টিকিট কিনেছেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বাকি দুটি আসনে গিয়েও দেখেন, সেখানে টিকিট নিয়ে যাত্রী বসা। বাধ্য হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ট্রেনে দাঁড়িয়েই রওনা হন তিনি।

মাসুদ রানাকে দেওয়া টিকিটের অন্য এক যাত্রীর নাম দেওয়া থাকলেও মোবাইল ফোন নম্বর ও এনআইডি নম্বর দেওয়া হয় আংশিক। ফলে অনুসন্ধানেও তাদের প্রকৃত পরিচয় জানা যায়নি। তবে ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানিয়েছেন, কালোবাজারিরা এই কৌশল ব্যবহার করে একই ট্রেনের একই আসনের টিকিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রি করছেন।

শহরের খরমপট্টি এলাকার অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সাধন দাসের ভাষ্য, আগে যখন কাউন্টার থেকে কাগুজে টিকেট বিক্রি হতো, তখনও কালোবাজারি হতো। অনলাইন চালু হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, এবার কালোবাজারি বন্ধ হবে। কিন্তু এখন উল্টো আরও বেড়েছে। ট্রেন ছাড়ার ১০ দিন আগে রাত ১২টায় অনলাইনে টিকেট বিক্রি শুরু হয়। এক মিনিট পর অনলাইনে ঢুকলেই দেখা যায়, সব টিকেট বিক্রি শেষ!

কিশোরগঞ্জের স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জ-ঢাকা রুটে এগারসিন্দুর নামে দুটি আর কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস নামে একটি আন্তঃনগর ট্রেন আপ-ডাউন চলাচল করে। প্রতিটি এগারসিন্দুর ট্রেনে প্রথম শ্রেণির ২০টি, শোভন চেয়ার ৫০টি, আর শোভন শ্রেণির ১৩৩টি আসন থাকে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির টিকিট ২৩০ টাকা, শোভন চেয়ারের টিকিট ১৬০ টাকা ও শোভন শ্রেণির টিকিটের দাম ১২৫ টাকা। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসন আছে ৯টি, আর কেবিনের আসন আছে ২১টি। পাশাপাশি শোভন চেয়ার ৯০টি আর শোভন শ্রেণির আসন আছে ১৮৫টি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসনের টিকেট ২৮৮ টাকা, আর কেবিনের প্রতি আসনের টিকিটের দাম ৩৪৫ টাকা। অন্যগুলোর দাম এগারসিন্দুরের মতোই।

এই স্টেশনে কালোবাজারির অভিযোগ পুরোনো। স্টেশনের পাশের পূর্ব তারাপাশা এলাকার সাইফুল ইসলাম, আব্দুর রজ্জাক, তাড়াইলের তপন বর্মণ, ভৈরবের সৌরভ হোসেনসহ বেশ কিছু কালোবাজারি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে ছাড়া পান তারা। কিশোরগঞ্জের জিআরপি থানা পুলিশ গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সাইফুল ইসলামকে টিকিটসহ গ্রেপ্তার করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত চার বুকিং ক্লার্কের নাম বলেন। তারা হলেন– বুকিং ক্লার্ক আব্দুর রহমান, পারভেজ, বিপ্রজিৎ ও রেদোয়ান। তিনি জানিয়েছিলেন, নিজেদের আইডির মাধ্যমে এই কর্মীরা মানুষের মোবাইল নম্বর ও এনআইডি দিয়ে টিকিট কেটে রাখেন। পরে কালোবাজারিদের কাছে ৩০ টাকা লাভে বিক্রি করেন। তারা আরও বেশি দামে বিক্রি করে। ওই স্বীকারোক্তির পর সাইফুলের সঙ্গে ওই চার বুকিং ক্লার্ককে আসামি করে এসআই মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে জিআরপি থানায় সেদিন মামলা করেন।

ওই মামলায় জিআরপি সম্প্রতি পাঁচজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন বলে জানান কিশোরগঞ্জ জিআরপি থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী। তিনি বলেন, এখনও যারা টিকেট কালোবাজারিতে জড়িত, মাঝেমধ্যে অভিযানে তাদের ধরা হয়। কিন্তু জামিনে এসে চোরাগুপ্তা কায়দায় কালোবাজারি চালিয়ে যায়। তবে জিআরপি থানা এ ব্যাপারে তৎপর।

কালোবাজারিতে স্টেশনের কেউ জড়িত আছেন এমন তথ্য জানা নেই বলে দাবি স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমানের। তিনি বলেন, গত বছর যে চারজন বুকিং ক্লার্কের নামে মামলা হয়েছিল, তারা এখানে দায়িত্ব পালন করেন না। অনলাইনে টিকেট কিনতে হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের মোবাইল নম্বর রেজিস্ট্রেশন থাকতে হয়। লেখাপড়া নেই, এমন মানুষের মোবাইল নম্বর রেজিস্ট্রেশনও করা নেই, তারা অনলাইনে টিকেট কিনতেও পারেন না। মূলত শিক্ষিত মানুষেরাই অনলাইনে টিকেট কেনেন। তাদের অনেকেই অনলাইনে টিকিট কিনে ‘এখন ঢাকায় যাচ্ছেন না’ প্রচার করে বাড়তি দামে বিক্রি করেন। কালোবাজারিরাও অন্য যাত্রীদের মোবাইল নম্বর ও এনআইডি নম্বর সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে ওই নম্বরের বিপরীতে অনলাইনে টিকিটি কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন। কখনও একই টিকিট একাধিক যাত্রীর কাছে বিক্রির খবরও শোনেন। এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

আরও পড়ুন

×