চাকসু নির্বাচন
ছাত্রদল-শিবিরের দুশ্চিন্তা ৩ প্যানেল
পূজার ছুটি শেষে আবার নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ঝুপড়ি এলাকায় প্রচারণায় সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের জিএস প্রার্থী সাকিব মাহমুদ রুমী। ছবি: মেহেদী হাসান
শৈবাল আচার্য্য ও মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:২৬
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের জয়ের পথে বড় বাধা হতে পারে তিনটি ছোট প্যানেল। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন, সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ ও সার্বভৌম শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদকের (জিএস) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির একাধিক যোদ্ধা ও সমন্বয়ক এসব প্যানেলে প্রার্থী হয়েছেন। এই তিন প্যানেলের প্রার্থীদের সমর্থন জোগাচ্ছে ভোটারের একটি বড় অংশ।
আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকে উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ার মতো অবস্থানও তৈরি করেছেন তারা। জুলাই আন্দোলনে পুরোভাগে থাকা মাহমুদ রুমি সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ব্যানারে জিএস পদে লড়ছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া পাঁচ নেতা নির্বাচন করছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল থেকে।
অনেকে মনে করছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকায় নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন তারা। পরিস্থিতি টের পেয়ে তিনটি ছোট প্যানেলের ভোট নিজেদের ব্যালটে আনতে নানা কৌশলে এগোচ্ছেন ছাত্রদল এ ছাত্রশিবিরের প্রার্থী-সমর্থকরা।
তবে নিজেদের ভোট অক্ষুণ্ন রাখতে ছাড় না দেওয়ার কথা বলছেন তিন প্যানেলের প্রার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট দলের প্যানেল হলেও প্রতিটি আবাসিক হল ও শহরে আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে তাদের। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণাও চালাচ্ছেন তারা।
আগামী ১৫ অক্টোবর হতে যাওয়া চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ১৩টি প্যানেলে ৯০৭ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চাকসুর ২৬ পদের বিপরীতে ৪১৫ জন এবং বিভিন্ন হল সংসদের ১৪ পদের বিপরীতে ৪৯২ জন। নির্বাচনে ভোটার ২৭ হাজার ৫২১ জন। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৮৪ ছাত্র, ১১ হাজার ৩২৯ ছাত্রী। ভিপি পদে ২৪, জিএস পদে ২২, এজিএস পদে ২১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলে প্রার্থী হয়েছেন জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন মাহফুজুর রহমান, রশিদ দিনার, মো. ইসমাইল, আব্দুল্লাহ আল মাহাথির ও পিয়াস হোসেন। এ ছাড়া মো. ইসমাইল, মো. জোবায়ের লিংকন, সাইফুল ইসলাম আহরাম ছিলেন আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে। আন্দোলনে সক্রিয় ও দাবি-দাওয়ার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে সহপাঠীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন তারা।
সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলে জিএস পদে লড়ছেন ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমি। জুলাই আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নানা কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসায় ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ তিনি। সাকিব মাহমুদ রুমি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে আমি সব সময় সোচ্চার ছিলাম। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও দাবি আদায়ে পাশে ছিলাম। শিক্ষার্থীদের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি। আমাদের প্যানেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থী যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন হিন্দু শিক্ষার্থী। তাই আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।’ রশিদ দিনার বলেন, ‘নির্বাচনে অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন? এটা আর কেউ মনে না রাখলেও শিক্ষার্থীরা মনে রেখেছেন।’
সার্বভৌম শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি প্রার্থী তাওসিফ মুত্তাকী চৌধুরী বলেন, ‘সব সময় আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে পাশে থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাদের পূর্ণ সমর্থনে ও তাদের দাবি আদায়ে আরও বড় ভূমিকা রাখতেই প্রার্থী হয়েছি। নিজের টিউশনির টাকা দিয়েই নির্বাচনী খরচ চালাচ্ছি। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে নিচ্ছেন ভোটাররা।’
ছাত্রশিবির প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, ‘নির্বাচনে বেশ কিছু প্যানেল অংশ নিচ্ছে। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতিটি প্যানেলেরই আলাদা ভোটব্যাংক থাকে। আমরা কোনো দলের হয়ে নয়, সব শিক্ষার্থীর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছি। তাই ভোট চাইতে প্রতিটি প্যানেলের ভোটারদের কাছে যাচ্ছি।’
ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, ‘চাকসু নির্বাচনের জন্য সবাই ৩৫ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন। নির্বাচনে বিভিন্ন প্যানেলের অংশগ্রহণকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখি। ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দ থাকে। অন্যান্য প্যানেল ভোটের সমীকরণে কিছুটা প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছি।’
বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের মতো নির্বাচন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছেন শিক্ষার্থীরাও। নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান শুভ বলেন, ‘ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ফোকাসে থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী অন্য কয়েকটি প্যানেলের পক্ষ নিয়েছেন। কারণ, এসব প্যানেলে রয়েছেন একঝাঁক জুলাইযোদ্ধা। শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। এটি ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলবে।’
চাকসু নির্বাচন কমিশনার এ কে এম আরিফুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘বেশ কয়েকটি প্যানেল অংশ নেওয়ায় নির্বাচন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।’ এ পর্যন্ত ছয়বার চাকসু নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনটি হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- চাকসু
- নির্বাচন
- ছাত্রসংসদ নেতা
