কালভার্টের মুখে খামার কারখানা পানিবন্দি শতাধিক পরিবার
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় পানি নিষ্কাশনে অব্যবস্থাপনার কারণে গোটা গ্রামে তীব্র জলাবদ্ধতা। বুধবার তোলা ছবি সমকাল
রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আনসার সদস্য সিদ্দিক মণ্ডলের বাড়ির উঠানে পানি। সামান্য বৃষ্টি হলে ঘরের ঢুকে পড়ে। তাদের পাড়ার ১০০ পরিবার একই অবস্থায় আছেন। পরিস্থিতি খারাপ দেখে অনেকেই বাড়িঘর ফেলে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়ি। গত ছয় মাস ধরে এ অবস্থা চলছে। ঘটনাটি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার চকাদিন গ্রামে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, এই গ্রামের পানি বের হওয়ায় জন্য একটি কালভার্ট রয়েছে। গ্রামের রেহেল হোসেন ও আশরাফ আলী নামে দুই ব্যক্তি সেই কালভার্টের মুখ বন্ধ করে সেখানে তুলার কারখানা ও মুরগির খামার নির্মাণ করেছেন। গত ছয় মাস ধরে প্রতিটি বাড়ির উঠানে পানি। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই পানি ঘরে প্রবেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সঙ্গে তারা বসবাস করছেন। বার বার ইউপি চেয়ারম্যানকে বলেও কাজ হয়নি। এ কারণে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, কাশিমপুর ইউনিয়নের কুবরাতলী চকাদিন গ্রামের চারপাশে পাকা সড়ক। মাঝখানে ১০৬টি পরিবারের বসবাস। গ্রামের উত্তর দিকে কুবরাতলী-ত্রিমোহনী হাট সড়কের চককুতুব এলাকায় একটি, দক্ষিণে রাণীনগর-আত্রাই আঞ্চলিক মহাসড়কের চকাদিন এলাকায় আরেকটি কালভার্ট রয়েছে। কালভার্ট দুটি দিয়ে এক সময় বৃষ্টির পানি নেমে যেত। এখন নালার মুখ মাটি ভরাট করে তুলার মিল ও মুরগির খামার গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলেই পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ছে।
মহল্লার বাসিন্দা শাকিলা বিবি বলেন, ৬ মাস ধরে ঘরে হাঁটুপানি। চৌকির ওপর কোনো রকমে রাত যাপন করতে হচ্ছে। আসবাব নষ্ট হচ্ছে। রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে সড়কের ওপর গিয়ে।
রকিব মণ্ডল জানান, কোমরপানি ভেঙে সড়কে যেতে হচ্ছে। ছোট শিশুরা স্কুলে পড়াশোনা করে। প্রতিদিনই বই-খাতা, পোশাক ভিজে তাদের চলাচল করতে হয়। এ ছাড়া পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ আর সাপ-পোকামাকড়ের ভয়তো আছেই। এক কথায় আতঙ্ক নিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
সাথী আক্তার বলেন, ‘তিন মাস আগে শ্বশুর মারা গেছেন, বাড়ির পাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও পানিতে ডুবে থাকায় দাফন করতে পারিনি। এটি আমাদের জন্য অনেক কষ্টের কারণ!’
চকাদিন গ্রামে বেশ কয়েকটি তুলার মিল আছে। জলাবদ্ধতার কারণে এসব মিল মালিকের ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাদেরই একজন শহিদুল ইসলাম। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে তাঁর গুদামে পানি ঢুকে আড়াই লাখ টাকার তুলা নষ্ট হয়েছে। পাশের উজ্জ্বল হোসেনের তিন লাখ টাকার তুলা নষ্ট হয়েছে। এভাবে কয়েকজন মালিকের অন্তত সাত লাখ টাকার তুলা নষ্ট হয়েছে। কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বার বার বলা হলেও তিনি কোনো সুরাহা করেননি।
অভিযুক্ত খামার মালিক আশরাফ আলী বলেন, ‘কালভার্টের নালার মুখেই আমার তিন বিঘা জমি রয়েছে। এ নালা দিয়ে মহল্লার পানি নিষ্কাশন হলে জমিতে চাষাবাদ করা যাবে না।’
তুলার কারখানা মালিক রেহেল হোসেন জানান, কালভার্টের নালা তাঁর জমির ওপর যুক্ত করা হয়েছিল। যে সময় তাঁর জায়গা পরিত্যক্ত ছিল। এখন প্রয়োজনে ভরাট করে তুলার কারখানা করেছেন। এরপরও পানি নিষ্কাশনের জন্য পাশ দিয়ে আরেকটি নালা করে দিয়েছেন। সেটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তারও দেড় লাখ টাকার তুলা নষ্ট হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, কালভার্টটি অনেক আগে নির্মাণ করা। সে সময় পরিকল্পনায় সামান্য ত্রুটি ছিল। কালভার্টের নালাটি পশ্চিম পাশে ছোট যমুনা নদীর সঙ্গে মিশিয়ে দিলেই এ দুর্ভোগ হতো না। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
- বিষয় :
- পানিবন্দি
