প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা শাকে মেটে পুষ্টির চাহিদা
আজাবা শাকের মেলায় উৎসবে মাতলেন গ্রামীণ নারীরা
নিজ নিজ বাড়ির আশপাশ থেকে সংগৃহীত শাক রান্না করছেন গ্রামীণ নারীরা। বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে সমকাল
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাকৃতিকভাবেই সড়কের ধারে, পতিত জমিতে বেড়ে ওঠে নানা জাতের শাকসবজি। এসব শাকসবজি দেশের গ্রামীণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির প্রধান উৎস। চাষ করা শাকসবজির ভিড়ে বাজারে এসব মিলছে কম। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের স্থানীয় খাদ্যভান্ডার ও চাষ ছাড়াই বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ সংরক্ষণে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী মেলা ও রান্না প্রতিযোগিতা। সেখানে গ্রামীণ নারীরা উৎসবমুখর পরিবেশে অংশ নেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আজাবা (চাষ ছাড়াই বেড়ে ওঠা) শাকের মেলা ও রান্নার প্রতিযোগিতা হয়। এতে আশপাশ এলাকার নারীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠিত হয় নিজ নিজ বাড়ির আশপাশ থেকে তোলা শাকের প্রদর্শনী। এখানে দুটি শাখায় পুরস্কৃত করা হয় গ্রামীণ নারীদের।
সিক্সটিন ডেজ অব গ্লোবাল অ্যাকশন অন এগ্রোইকোলজি-২০২৫ ও বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে ছিল এই আয়োজন। যৌথভাবে এর আয়োজন করে সবুজ সংহতি ও জনসংগঠন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত মেলায় থানকুনি, হেলেঞ্চা, শাপলা, গাদোমনি, আদাবরুণ, পিপুল, বউটুনি, তেলাকুচো, দূর্বা, গিমি, সেঞ্চি, বামনআঁটি, কলমি, কচুশাক, নাটা, কাটানুটি, ঘুমশাক, ডুমুর, তিতবেগুন, বৌটুনি, আমরুল, ঘিকাঞ্চন, কাথাসহ ৪০ প্রকার শাকের প্রদর্শনী হয়। এ ছাড়াও প্রায় ৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ তোলা হয়, যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে।
মেলায় অংশ নিয়েছিলেন জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষানি আল্পনা রানী মিস্ত্রি। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল এক সময় নানা শস্য ও ফসলে ভরা ছিল। আধুনিক কৃষি ও বাজারনির্ভর খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এসব বৈচিত্র্যপূর্ণ ফসল বিলুপ্তির পথে। এ জন্য তিনি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের প্রাপ্তিস্থান বিলুপ্ত হওয়া, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, এসব শাকসবজিই মূলত গ্রামীণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির প্রধান উৎস। তাই উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
আয়োজনের পুরস্কার বিতরণীতে অংশ নিয়েছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজিব বাছাড়। তাঁর ভাষ্য, এসব শাকের মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি রয়েছে। এসব শাক দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে এসব শাক। এ ধরনের মেলা বা প্রদর্শনীর উদ্যোগের প্রশংসার পাশাপাশি প্রকৃতি থেকে পুষ্টি চাহিদা পূরণে এসব শাক সংরক্ষণে উদ্যোগী হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মেলায় অংশগ্রহণকারীরা এসব উদ্ভিদের গুণ, প্রাপ্তিস্থান, মৌসুম; কোনটি মানুষের, কোনটি প্রাণীর খাবার; কীভাবে খাওয়া যায়, তা তুলে ধরেন। সেখানে সর্বোচ্চসংখ্যক চাষ ছাড়া বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ প্রদর্শন করে প্রথম স্থান অধিকার করেন মালতী রানী। দ্বিতীয় হন শিখা রানী, তৃতীয় হন পৃথা রানী। রান্না প্রতিযোগিতায় যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন ইতি রানী, রিংকু রানী ও অঞ্জলি রানী।
সবুজ সংহতির সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল আলিম, ইউপি সদস্য কমলা রানী মৃধা, কৃষানি মিতা রানী, কৃষক চিত্তরঞ্জন, বারসিক কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ জোয়ারদার, বিশ্বজিৎ মণ্ডল, মফিজুর রহমান, মিলন হোসেন, বরষা রানী প্রমুখ।
- বিষয় :
- পুষ্টি
