‘যে চাল পেয়েছি তাতে ১০ দিনও চলে না’
রাজবাড়ী সদরের গোদারবাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার মাছ ধরছে কয়েক শিশু-কিশোর সমকাল
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজবাড়ীতে কেউ খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল পেয়েও ইলিশ মাছ ধরছেন, আবার কেউ তা না পেলেও নদীতে যাচ্ছেন না। জেলে নয়, এমন লোকেরও চাল পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জেল-জরিমানা, নৌকা নিলাম কোনো কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না জেলেদের। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা পদ্মা নদীতে ইলিশ শিকার করছেন। তারা বলছেন, খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে, তাতে তাদের ১০ দিনও চলে না। এর বাইরে সংসারের অন্যান্য খরচাপাতি তো রয়েছেই। ফলে পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই তারা নদীতে জাল ফেলছেন।
গত বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে রাজবাড়ী শহরতলির গোদারবাজার থেকে সোনাকান্দর মৌলভীঘাট পর্যন্ত পদ্মা নদী ঘুরে দেখা যায়, নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ আর স্রোত উপেক্ষা করে ছোট-বড় বিভিন্ন নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরছেন। ট্রলারচালিত এসব নৌকা কোনোটা মাঝনদীতে আবার কোনোটা তীরের কাছাকাছি চলছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতে প্রচুর নৌকা থাকে মাঝপদ্মায়। ওই সময় টহল না থাকার সুযোগে জেলেরা বেশি মাছ শিকার করেন। মাছ বিক্রিও হয়ে যায় ফোনে ফোনে। আবার অনেক জেলে ভ্যান নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করেন। বড় আকারের মাছ এক হাজার টাকা কেজি এবং ছোট আকারের মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
সকাল ৮টার দিকে গোদারবাজার ঘাটে একটি নৌকা এসে থামে। নৌকায় পাঁচজন জেলে। তাদের কাছে বাক্সভর্তি ইলিশ। এ সময় একজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলতে রাজি হন। তিনি জানান, তাদের একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য ১৮ জন। এর মধ্যে মাত্র চারজন কর্মক্ষম। তিনজন মাছ ধরেন, একজন রিকশা চালান। মাছ না ধরলে তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। আষাঢ় মাস থেকে তারা ভালোভাবে নদীতে মাছ ধরতে পারেন না। কারণ, বর্ষা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা খুবই কঠিন। পরে যখন মাছ ধরার সময় আসে তখন দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা।
তিনি আরও জানান, সাধারণত তাদের জালে কখনও ইলিশ বা বড় মাছ ওঠে না। এই সময়টায় ইলিশ পাওয়া যায়। এ কারণে ঝুঁকি নিয়েই মাছ ধরতে নামেন। গত বছরও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করেছিলেন। খুব কৌশলে তারা মাছ ধরেন এই সময়টায়।
ওই জেলে জানান, তিনি ও তার দুই ভাই নিবন্ধিত জেলে। এ বছর চালও পেয়েছেন। কিন্তু সব মিলিয়ে যে চাল পেয়েছেন তাতে তাদের ১০ দিন চলে। বাকি দিনগুলো চলবে কীভাবে? এরপর তরিতরকারি, মসলা, তেল– এসব কিনবেন কী দিয়ে। এমনিতেই ঘাড়ের ওপর ঋণের বোঝা। আর কত ঋণ করবেন? তাই বাধ্য হয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে মাছ ধরতে নামেন নদীতে। সংসার তো চালাতে হবে!
রাজবাড়ীর সজ্জনকান্দা গ্রামের বাসিন্দা আনন্দ সরকার নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি নিবন্ধিত জেলে। অথচ চাল পাননি। আনন্দ জানান, নদীতে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞার পর খুব কষ্টে আছেন। খাল-বিল ঘুরে ঘুরে অল্পস্বল্প মাছ পাচ্ছেন। এতে দিনে দুইশ থেকে তিনশ টাকা আয় হয়। তা দিয়ে সাত সদস্যের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
অনেকে ২৫ কেজির কম পেয়েছেন
সরকার চলতি বছরের ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ সময়ের জন্য জেলেপ্রতি খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। রাজবাড়ী জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, রাজবাড়ী জেলায় নিবন্ধিত জেলে ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে যুক্ত পাঁচ হাজার ৭৭৭ জন। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৯৭ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি উত্তম কুমার সরকার জানান, রাজবাড়ী পৌরসভায় নিবন্ধিত জেলে ২৮১ জন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৫০ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৫৮ জন সহায়তার চাল পেয়েছেন। অনেকেই ২৫ কেজির জায়গায় দুই থেকে তিন কেজি কমও পেয়েছেন। আবার সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নে জেলে নয়, এমন লোকও চাল পেয়েছেন। বারবার মৎস্য কর্মকর্তাদের তিনি বিষয়টি বলেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তিনি আরও বলেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকুক, এটা তিনি মনেপ্রাণে চান। তার সমিতির সদস্যরা চাল না পেলেও মাছ ধরতে যাননি। অনেকেই এই সময়টাতে মানবেতর জীবনযাপন করেন। তবুও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারা।
উত্তম কুমার সরকার বলেন, ইলিশ ধরা বন্ধে শুধু আইন করলে হবে না। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন– জেলেরা যাতে মুক্ত জলাশয়, নদী, খাল-বিলে ১২ মাস মাছ ধরতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক জলাশয় শুকিয়ে গেছে। সেগুলোতে ১২ মাস পানি থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে চলাচল করা সব নৌকা আটকে রাখতে হবে। তাহলেই বন্ধ হবে মাছ শিকার।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুব উল হক বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। সেসব দেশে প্রণোদনা দেওয়া হয় না। আমাদের দেশে চাল দেওয়া হয় যাতে জেলেরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। যদিও ২৫ কেজি চাল বড় কিছু নয়। আগামী বছর থেকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার বিষয়টি তারা চিন্তাভাবনা করছেন।
তিনি বলেন, তাদের যে জনবল এবং লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে, তা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা নদী পাহারা দেওয়া খুবই দুরূহ। তারা এই সময়টাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন জেলেদের মাছ ধরা বিরত রাখতে। তিনি বিশ্বাস করেন প্রকৃত জেলেরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরতে যান না। কিছু অসাধু জেলে এই কাজগুলো করেন।
জেলে না হয়েও চাল পাওয়ার বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, কিছু কিছু জায়গায় এমন হতে পারে। উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাইয়ের সময় ভুলভ্রান্তি করে থাকতে পারে। অনেক সময় পেশা পরিবর্তনের তথ্য গোপন করেই চাল নেয়। আগামীতে যাতে নিখুঁতভাবে হয় সে চেষ্টা করবেন। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে নৌকা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তিনি সুপারিশমালায় তুলে ধরবেন।
অভিযানেও কমছে না শিকার
গত ১৪ দিনে ৮৭ জন জেলেকে কারাগারে পাঠিয়েও খুব একটা লাভ হয়নি। দিনের বেলা যেমন তেমন, রাত হলেই নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন জেলেরা। সূত্রমতে, গত ৪ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাজবাড়ীর পদ্মায় ৯৮টি অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। এতে ৩৮১ কেজি ইলিশ মাছ ও ৯ লাখ ৯৩ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। অভিযানের পর ৩১টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮৭ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা আদায় করা হয় ৭৩ হাজার টাকা।
- বিষয় :
- চাল
