মনিরামপুর ও জীবননগরের চাল গুদাম যেন দুর্নীতির আখড়া
যশোর অফিস ও চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
যশোরের মনিরামপুর ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে দুই গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি চাল নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। মনিরামপুরে মতিয়ার রহমানের সময়ে কেনা আড়াই টন চাল ও পাঁচ হাজার ৫৫০টি সরকারি বস্তার হদিস নেই।
অন্যদিকে জসিম উদ্দিন জীবননগরে মানুষের খাওয়ার অযোগ্য প্রায় হাজার টন চাল কিনেছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে দুজনই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে অনিয়ম পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগীয় খাদ্য কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, মনিরামপুর এলএসডিতে চাল নিয়ে অনিয়মের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পেলে জীবননগরের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিন্ডিকেটের হোতা জসিম
জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন খাদ্য বিভাগের চাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যদের ‘ম্যানেজ’ করে জীবনগরে খাওয়ার অযোগ্য প্রায় হাজার টন চাল কেনার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি।
সূত্র জানায়, মাসখানেক আগে জীবননগর এলএসডিতে পদায়ন হয় মাসুদ রানার। তিনি সরেজমিন গুদামে নিম্নমানের চাল থাকার বিষয় টের পেয়ে যোগদান না করে অন্যত্র বদলির আবেদন করেন। পরে মাসুদকে মেহেরপুরে বদলি করা হয়। আলমডাঙ্গার গুদাম কর্মকর্তা আসেন জীবননগরে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিম্নমানের চাল কেনার বিষয় ধামাচাপা দিতে জসিম উদ্দিন খাদ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে আলমডাঙ্গার কর্মকর্তাকে জীবননগরে বদলি করিয়েছেন।
জীবননগরের এফএস/১ গুদামের দুই নম্বর পুরাতন খামালে ৬৩, বটতলার ডানপাশে শেষ খামালে ২০ টনসহ চারটি খামালের প্রায় ৯৬ টন চাল লালচে হয়ে গেছে এবং তাতে খুদ মেশানো। আর এসএফ/২ গুদামে দুই বছর আগে কেনা ২১১ টন চালের পুরোটাই খাওয়ার অযোগ্য। সব খামাল মিলে আরও ৭০০ টনের মতো খাওয়ার অযোগ্য চাল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জসিমের সময়ে নিয়ম ভেঙে খামালে আমন ও বোরো চাল একসঙ্গে এবং পুষ্টি চালের সঙ্গে অন্য চাল মেশানো হয়েছে।
সরকারি নিয়মে ৩০ কেজির বস্তায় কমপক্ষে ৩০০ গ্রাম চাল বেশি থাকবে। কিন্তু জসিমের সময়ে কেনা একাধিক গুদামের কয়েকটি খামালের সব বস্তায় ওজন কম। মিল মালিকদের কাছ থেকে কমিশন খেয়ে তিনি এ অপকর্ম করেছেন।
একাধিক মিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টাকা পেলে জসিম উদ্দিন দিনকে রাত এবং রাতকে দিন বানানো ছাড়া সবই করতে পারেন।
এর আগে জসিম ঝিনাইদহে থাকাকালীন ৩০০ টন সরকারি চাল বিক্রির অভিযোগে র্যাবের হাতে আটক হন। কুষ্টিয়ায় চাকরির সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। জসিমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে মাগুরার নিজ এলাকায় একটি খুনের মামলা বিচারাধীন।
অভিযোগের বিষয়ে জসিম উদ্দিনের মোবাইল নম্বরে কল দিলে রিসিভ করেননি। এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলে সাড়া পাওয়া যায়নি। গত রোববার দপ্তরে গিয়েও জসিমকে পাওয়া যায়নি। পরে অন্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে তিনি প্রতিবেদন না করার জন্য অনুরোধ করেন।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে নিয়েছি।
সরকারি বস্তাও মতিয়ারের পেটে
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মনিরামপুর এলএসডিতে ভারপ্রাপ্ত খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হয় খাদ্য পরিদর্শক পলাশ আহমেদের। তাঁকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু পলাশকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে টালবাহানা করেন গুদাম কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান। পরে পলাশ জেলা ও বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন, মনিরামপুর এলএসডির সব গুদামের খামাল এবং বস্তা গণনা ছাড়া তিনি দায়িত্ব নেবেন না। এ ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি করে সরেজমিন গুদামে রক্ষিত চালের খামাল গণনা করা হয়। এতে গুদামের ২৫-২৬ নম্বর খামালে প্রায় আড়াই টন চাল কম পাওয়া যায়। একই সঙ্গে দুই নম্বর গুদামের তিন হাজার ৫২৫টিসহ মোট পাঁচ হাজার ৫৫০ বস্তা হাওয়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত দলের এক সদস্য জানান, তদন্তে তারা গুদাম কর্মকর্তা মতিয়ার রহমানের নানা অনিয়ম পেয়েছেন। নিম্নমানের চাল কিনে গুদামজাতের পাশাপাশি তিনি গুদাম থেকেও বিক্রি করেছেন। সরকারি বস্তা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন মতিয়ার। তদন্ত দল গেলে সহযোগিতা না করে তিনি বদলির আদেশ ঠেকাতে ঢাকায় যান।
মতিয়ার রহমান এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই বলে জানান।
- বিষয় :
- চাল
