ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২২ বছর ভেসে বেড়ানো মা-ছেলের শান্তির নীড়

২২ বছর ভেসে বেড়ানো মা-ছেলের শান্তির নীড়
×

বাবুগঞ্জে মা-ছেলের জন্য নির্মিত ঘর সমকাল

আরিফ আহমেদ মুন্না, বাবুগঞ্জ (বরিশাল)

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুঃখ আর দুর্ভাগ্য সঙ্গে নিয়ে জন্ম হয়েছিল বলে নানা তার নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। মায়ের গর্ভে থাকতেই তাকে অস্বীকার করেন তার জন্মদাতা। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া দুখু মিয়াকে জন্মের আগে-পরে হত্যারও চেষ্টা হয়। গ্রাম থেকে পালিয়ে যেতে হয় তার কিশোরী মাকে। এক পর্যায়ে পুরো পরিবারকেই হতে হয় গ্রামছাড়া। কাজ নিতে হয় ইটভাটায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে ধর্ষককে আদালত যাবজ্জীবন সাজা দিলেও দুখুর মেলেনি সন্তানের অধিকার কিংবা সমাজের স্বীকৃতি। 

দুখু মিয়া এবং তার লড়াকু মায়ের দুর্দশার কথা জেনে তাদের স্থায়ী ঠিকানা দিতে উদ্যোগ নেন বরিশালের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তিনি বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে এ উপজেলায় কেনেন একখণ্ড জমি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুদানে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি বসতঘর। নাম রাখা হয় শান্তির নীড়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মা-ছেলের কাছে ঘরের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক।  

এ সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ.কে.এম আক্তারুজ্জামান তালুকদার, সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেন, সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 
৩ শতাংশ জমিসহ বসতঘর পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন দুখুর মা। তিনি বলেন, দুখু মিয়াকে নিয়ে ২২টি বছর অনেক কষ্ট দুর্ভোগ সহ্য করেছি। অবশেষে আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। বাবুগঞ্জ ইউএনও ফারুক আহমেদ বলেন, পরিবারটিকে সহযোগিতা করার জন্য বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সব সময় পাশে থাকবে। বরিশাল জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় ওই নারী আজ মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেয়েছেন। তাঁর সন্তানের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে একটি এনজিও। ভবিষ্যতে তার চাকরির বিষয়টা আমাদের সবার বিবেচনায় থাকবে। 

২০০৩ সালে সালাম সরদারের ছেলে গিয়াস উদ্দিনের ধর্ষণে ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। সালিশে বিয়ের রায় এলেও সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে কিশোরীকে গর্ভপাতের জন্য চাপ দেন গিয়াস ও তার পরিবার। কিশোরী ও তার মাকে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা কিশোরী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বাবুগঞ্জ থানায় মামলা করেন ওই কিশোরী। এরপর গিয়াস গ্রেপ্তার হলে তার প্রভাবশালী মামারা সাত ভাইবোনসহ কিশোরীর পরিবারকেও গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন। তাদের ঠাঁই হয় একটি ইটভাটায়। সেখানে মাটি কাটার কাজ নেন ওই কিশোরী ও তার মা। ২০০৪ সালের ৯ জুন জন্ম নেয় দুখু মিয়া। 

২০০৪ সালের ৭ অক্টোবর জামিনে ছাড়া পেয়ে দুখুকে হত্যার চেষ্টা চালান গিয়াস। পরে মা ও শিশুকে নিরাপত্তার জন্য সেইফ হোমে পাঠান আদালত। প্রায় দুই বছর সেখানে থাকার পরে এক ব্যক্তির বাড়ির পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় মেলে পরিবারটির। পরে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই কিশোরী সংসার চালাতে আড়াই বছরের দুখুকে মায়ের কাছে রেখে ২০০৬ সালে পাড়ি জমান ঢাকায়। একটি গার্মেন্টসে দুই হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। ছোট ছয় ছেলেমেয়ে আর দুখুর খরচ চালাতে বিভিন্ন বাড়িতে বুয়ার কাজ নেন দুখুর নানি। 

২০১১ সালের ২৪ মার্চ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল একমাত্র আসামি গিয়াস উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে দুখু মিয়ার বয়স ২১ বছর না হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করার আদেশ জারি করেন। ওই রায়ের পরে মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে দুখু মিয়ার জন্য প্রতিবছর গড়ে এক লাখ টাকা করে এ পর্যন্ত ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বর্তমানে দুখু মিয়া দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। 

দুখু মিয়ার ২১ বছর পূর্ণ হলে সম্প্রতি তার ভরণপোষণের শেষ কিস্তির টাকার বরাদ্দ এলে বরিশাল জেলা প্রশাসক ঘটনাটি জেনে বিস্মিত হন। এর পরই তিনি মা-ছেলের স্থায়ী ঠিকানা 
নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বরাদ্দের পাশাপাশি অর্থ সহায়তা করেন বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদ এবং সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির। 
 

আরও পড়ুন

×