কর্মহীন হওয়ার শঙ্কায় তাঁতশিল্পে জড়িত ৫ হাজার মণিপুরি নারী
তাঁতে কাপড় বুনছেন দুই নারী। বর্তমানে তাঁতবস্ত্র ও কুটির শিল্পপণ্যের বাজার নেই বললেই চলে সমকাল
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মৌলভীবাজারের মণিপুরি জনগোষ্ঠীর তাঁতশিল্পীদের ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বর্তমান বাজারে এই আদিবাসী গোষ্ঠীর তৈরি তাঁতবস্ত্র ও কুটির শিল্পপণ্যের বাজার নেই বললেই চলে। এমন অবস্থায় অন্তত ৫ হাজার মণিপুরি নারী কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
মণিপুরি, খাসিয়া বা চাকমা–আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথার অনুসারী। এই আদিবাসী নারীরাই মূলত বংশ পরম্পরায় তাঁতবস্ত্রের মতো কুটিরশিল্পের উদ্ভাবক ও মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ধরে রেখেছেন ২০০ বছরের এই ঐতিহ্য।
বর্তমানে এসব তাঁতবস্ত্রের বাজার মন্দা। স্থানীয় পর্যায়ে এর যেটুকু চাহিদা আছে তাকে পুঁজি করে কিছু কিছু পরিবার চলছে। মৌলভীবাজার অঞ্চলের অন্তত ৫ হাজার মণিপুরি নারী তাঁতবস্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বলছেন, বাজার না থাকায় নতুন প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই এই ক্ষেত্র থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে শুরু করেছে। এই খাত ধ্বংস হয়ে গেলে বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রায় ৫ হাজার নারী বেকার হয়ে যাবেন।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই বলছেন, ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে মৌলভীবাজার তথা সিলেট অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পণ্য বাজার মাতিয়েছে। আদিবাসী গোষ্ঠীর অন্যতম কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও ছিল এটি। মণিপুরি তাঁতপণ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনও পেয়েছে। কিন্তু আধুনিক বাজারের উপযুক্ত করে এটিকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
মণিপুরি তাঁতবস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কয়েকজন জানান, তাদের জীবিকার এক সময়ের প্রধান এই অবলম্বন এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিচায়ক ধ্বংসে একটি বিশেষ মহল জড়িত। তারা মণিপুরিদের আদলে কিন্তু নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে বাজারে ছেড়েছিল। বাজার থেকে নিজেদের মুনাফা লুফে নিয়ে তারা সরে পড়েছে। মানহীনতার দায় কাঁধে নিয়ে দুর্নাম আর ভোগান্তি বইতে হচ্ছে মণিপুরিদের।
এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় সরব হয়েছেন এই জনগোষ্ঠীর দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠন। তবে কাজের কাজ সেভাবে হচ্ছে না। সর্বশেষ গেল শনিবারে কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝেরগাঁও কমিউনিটিবেইজ পর্যটনকেন্দ্রে মণিপুরি হস্তশিল্পী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এ বিষয়ে সরকারকে বার্তা দেন।
সেখানে ভুক্তভোগীরা জানান, ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে এসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ভানুবিল মাঝেরগাঁওসহ বিভিন্ন গ্রামে বসতি গড়ে তুলেছিলেন তাদের পূর্বজরা। নিজেদের জীবন ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম এবং জাতিগত ঐতিহ্যের শৈল্পিক কাজকে শুরু থেকেই চর্চা করে আসছেন তারা। তাঁতশিল্পের বিনাশকে তারা তাদের জাতিগত পরিচয় বিলুপ্তির অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচনা করছেন। এটিকে রক্ষায় তারা সরকারসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহায়তা প্রত্যাশা করেন।
বক্তারা জানান, ২০২২-২৩ সাল থেকে একটি কুচক্রী মহল কমলগঞ্জের আদমপুর বাজারে উইভিং ফ্যাক্টরি স্থাপন করে এবং কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীতে একই ধরনের কারখানা নির্মাণ করে মণিপুরি শাড়ির অনুকরণে নিম্নমানের কাপড় তৈরি করে কম দামে বাজারে ছাড়ে। ফলে তাদের আসল পণ্য দামের কারণে বাজার হারাতে থাকে। এক পর্যায়ে মানহীনতার দায় নিয়ে ধসে পড়ে তাদের এই পণ্যের বাজার।
মাঝেরগাঁওয়ের অরুণা দেবী জানান, মণিপুরি তাঁতে একখানা মোটামুটি মানের শাড়ি বুননে দুজন নারীর কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ দিন সময় লাগে। সুতাই লাগে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার। সব মিলিয়ে একটা শাড়ির খরচ পড়ে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে।
পাইকারি ক্রেতারা সেটি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনে নেন। অন্যদিকে পলিয়েস্টার সুতা মিশিয়ে নকশা জাল করে মেশিনে উৎপাদিত শাড়িগুলো দেখতে তাদেরগুলোর মতো হলেও নিম্নমানের। ক্রেতার সামনে তাদের এক হাজার থেকে বারোশ টাকার শাড়ি মণিপুরিদের আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা মূল্যের শাড়িকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। এতে করে ক্রেতা মান এবং তারা বাজার হারাচ্ছেন।
একই গ্রামের কল্পনা দেবী ও গীতা দেবী জানান, এক সময় ভানুবিল, শনগাঁও, নয়াপত্তন, ভান্ডারিগাঁওসহ মণিপুরি অধ্যুষিত ১৪টি গ্রামের ঘরে ঘরে দিন-রাত তাঁত চালানোর শব্দ শোনা যেত। এখন তাঁত চালিয়ে সুতা লাগিয়ে, মজুর খাটিয়ে তৈরি করা শাড়ি আর কেউ করতে চায় না।
মণিপুরি মুসলিম এডুকেশন ট্রাস্টের সভাপতি কবি আব্দুস সামাদ জানান, মণিপুরি তাঁতশিল্প নারীদের দ্বারা পরিচালিত একটি শিল্প। এর সঙ্গে শুধু জীবন-জীবিকা জড়িত নয়, অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মিশে আছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আদমপুরবাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর মুন্না রানা, কলাবতী শাড়ি তৈরি
করে দেশব্যাপী সাড়া জাগানো রাধাবতী দেবী, ডা. মো. কায়াম উদ্দিন, মনিপুরি কবি সনাতন হামহামসহ অনেকেই।
- বিষয় :
- কর্মচারী
