ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘কলিজার টুকরারে শেষ বিদায়ও দিতে পারলাম না’

‘কলিজার টুকরারে শেষ বিদায়ও দিতে পারলাম না’
×

ভূমিকম্পে মারা যাওয়া ১০ মাসের শিশু ফাতেমা

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪১ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘কলিজার টুকরারে শেষ বিদায় দিতে পারলাম না। দাফন করার সময় তারে একবার দেখতেও পারলাম না, কোলেও নিতে পারলাম না, আল্লাহ! এমন দিন যেন কোনো বাবার ভাগ্যে না আসে।’
মোবাইল ফোনে আহাজারি করে কথাগুলো বলছিলেন সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল হক। গতকাল শুক্রবার ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে তাঁর ১০ মাসের সন্তান ফাতেমা মারা গেছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকার এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আব্দুল হকের স্ত্রী কুলসুম বেগম (৩০) ও প্রতিবেশী জেসমিন আক্তার (৩৫)। ঘটনার পর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছেন আব্দুল হক। এ কারণে মেয়ের দাফনের সময়ও থাকতে পারেননি। বিকেলে বাড়ির পাশে ফাতেমার জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। 

তারা জানান, আব্দুল হক চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। দুই মেয়ে নিয়ে রূপগঞ্জের ইসলামবাগের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন কুলসুম। পাশের বাসায় ভাড়া থাকেন কুলসুমের মা-বাবা। গতকাল সকালে তিনি ফাতেমাকে কোলে নিয়ে বাবার বাসায় যাচ্ছিলেন। এ সময় ভূমিকম্প টের পেয়ে রাস্তার ধারে একটি সীমানাপ্রাচীরের পাশে আশ্রয় নেন। প্রতিবেশী জেসমিনও সেখানে আশ্রয় নেন। কিন্তু ভূমিকম্পের কারণে মুহূর্তেই ধসে পড়ে সেই প্রাচীর। এতে চাপা পড়েন তারা। ঘটনা দেখে দৌড়ে সেখানে যান প্রতিবেশী ইমতিয়াজ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘ইট সরাইতে সরাইতে ফাতেমারে বাহির করলাম, কিন্তু বাঁচানো গেল না।’

কুলসুমের দুলাভাই মোহাম্মদ হোসেন মোবাইল ফোনে জানান, আব্দুল হক তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দুপুর থেকে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছেন। রাত ৮টা পর্যন্ত তিনটি হাসপাতালে গেলেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। দুটি হাসপাতালে শয্যা না থাকায় ভর্তি নেওয়া হয়নি। শুরুতে রূপগঞ্জের ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় কুলসুমকে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসার পর শয্যা না থাকার কথা জানানো হয় স্বজনদের। পরে তাঁকে বেসরকারি ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ভর্তি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন চিকিৎসক।

মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘দুপুর থেইকা আমরা ঘুরতেছি। ঢাকা মেডিকেলে খালি ওয়াশ কইরা ব্যান্ডেজ কইরা বলে সিট নাই, বাড়িতে নিয়ে যেতে। কিন্তু মাথায় এমন আঘাত পাওয়া রোগী যার কোনো হুঁশ নাই, কথা বলতে পারে না, তারে কেমনে বাড়িতে নেই। কোথাও ভর্তি করাতে পারতেছি না।’

তিনি জানান, ন্যাশনাল মেডিকেলের চিকিৎসকদের পরামর্শে তারা আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘ওই হাসপাতালে যাওয়া পর্যন্ত কুলসুম বাঁচে কিনা শিওর না। তার শালির দুই মেয়ে। আরেক মেয়ে দুই বছরের নুসাইবা জান্নাত ঘটনার সময় পাশেই তার নানাবাড়িতে ছিল। যে কারণে তার কিছু হয়নি।’

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ধসে পড়া প্রাচীরটি অন্তত ১০ ফুট উঁচু ছিল। কিন্তু কোনো রডের কাজ সেখানে নেই। এমনকি উঁচু দেয়ালের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোনো পিলারও ছিল না। এ ধরনের অস্বাভাবিক রকম উঁচু দেয়াল বা অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হবে। নিহতের পরিবারকে দাফনের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×