রাজশাহীতে এক দশকে ৮০০ পুকুর ভরাট
ছবি: সমকাল
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:০৬ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৪:১৩
রাজশাহী মহানগরীতে গত ১০ বছরে প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পুকুর ছিল ৪৮টি। তবে আশার খবর হলো, ভরাট করে ফেলা পুকুর পুনর্খনন শুরু করেছে প্রশাসন।
এদিকে নগরীর মোল্লাপাড়া মৌজায় ৬৩ শতাংশ আয়তনের এই পুকুরটি কয়েকদিন ধরে গোপনে ভরাট চলছিল। ইতোমধ্যে পুকুরটির সিংহভাগ ভরাট করে ফেলা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে অভিযানে যান। তার আগেই পুকুর ভরাটের সঙ্গে জড়িতরা পালিয়ে যায়।
অভিযানে নিজেই গিয়েছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ। তিনি জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ হলেও যারা এই কাজটি করছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুনর্খননের খরচ পুকুরখেকোদের কাছ থেকে আদায় করা হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে পুকুরপাড়ে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার নির্দেশ দেন, পুকুরটি আগে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এরপর খননযন্ত্র দিয়ে ভরাট করা মাটি তুলে পুকুরটি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। পুকুর পুনর্খনন না হওয়া পর্যন্ত সেখানে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
স্থানীয়রা জানান, খাইরুল ইসলাম খোকন ও মাহমুদুল হাসান নামের দুই ব্যক্তি পুকুরটির মালিক। সম্প্রতি পুকুরটি ভরাট শুরু করেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। স্থানীয়রা বিষয়টি গত শুক্রবার বোয়ালিয়া থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেনকে জানান। এরপর তিনি গিয়ে সবাইকে সতর্ক করে আসেন। কিন্তু শনিবার থেকে পুরোদমে ভরাটকাজ চলতে থাকে।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারকে অবহিত করেন। অভিযোগ পেয়ে বিভাগীয় কমিশনার নিজেই ওই পুকুর উদ্ধার করতে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। সিটি করপোরেশন এলাকায় পুকুর ভরাট করা নিষিদ্ধ। তাই এই পুকুরটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু হয়েছে। এখানে যে ব্যয় হবে, সেটা আমরা ভরাটকারীদের কাছ থেকে আদায় করব। এই পুকুর ভরাটের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, এই পুকুর ভরাটের খবর পেয়েই বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আমরা ঘটনাস্থলে এসে কাউকে পাইনি। তারপরও যাদের নামে এ জমি আছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত মামলা করব।
এক সময় রাজশাহী শহরে অসংখ্য পুকুর ছিল। কিন্তু অল্প কিছু পুকুর ছাড়া সবই ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপি) পক্ষে অ্যাডভোকেট শওকত আলী রেন্টু ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। তখন বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় গণনা করে নগরীতে ৯৫২টি পুকুরের অস্তিত্ব পায়। ২০২২ সালের ৮ আগস্ট হাইকোর্ট এই পুকুরগুলো সংরক্ষণসহ কয়েকটি নির্দেশনা দেন। রাজশাহী শহরে আর কোনো পুকুর যেন ভরাট না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়।
পাশাপাশি ভরাট হওয়া পুকুরগুলো আগির অবস্থায় ফিরিয়ে আনারও নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। সিটি মেয়র, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। কিন্তু ওই নির্দেশনার পরও শহরে একের পর এক পুকুর ভরাট হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল জানান, গত এক দশকে প্রায় ৮০০ পুকুর বাস্তবে ভরাট হয়ে যায়। একই সময়ে সরকারি ৪৮টি পুকুরের মধ্যে ১৭টি ভরাট হয়ে যায়। এর মধ্যে সরকারি প্রয়োজনে আটটি এবং ৯ পুকুর অবৈধভাবে ভরাট হয়েছে। বর্তমানে শহরে সরকারি ও ব্যক্তিগত মিলিয়ে ১৫০টি পুকুর অবশিষ্ট আছে।
- বিষয় :
- রাজশাহী
- পুকুর
- পুকুর ভরাট
