ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পিডিবির কারসাজিতে দিশেহারা গ্রাহক

পিডিবির কারসাজিতে দিশেহারা গ্রাহক
×

ছবি- সংগৃহীত

সোলায়মান হোসেন হরেক, সরিষাবাড়ী (জামালপুর)

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরিষাবাড়ী উপজেলায় পিডিবির সেচ সংযোগ দুই হাজার ৪১১টি। তার মধ্যে এক হাজার ৬১১টিই অবৈধ। মিটারবিহীন সংযোগ। গ্রাহক বিল দেন কাল্পনিক মিটার নম্বরে। বিল পরিশোধে গড়িমসি হলেই অবৈধ সংযোগ দেখিয়ে বিদ্যুৎ আইনে মামলা দেওয়া হয়। গুনতে হয় অবৈধ সংযোগের দায়ে চারগুণ অর্থ। মৃত গ্রাহকের নামেও আসছে বিদ্যুৎ বিল।

সেচপাম্প গ্রাহক ও পিডিবির তথ্যমতে, সরিষাবাড়ী উপজেলায় বোরো চাষের জন্য সেচপাম্পের চাহিদা অনেক। এ জন্য দুই হাজার ৪১১টি সেচ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সেচপাম্পের গ্রাহককে পিডিবির একটি করে মিটার সরবরাহ করা কথা। বিদ্যুৎ খরচ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করার কথা গ্রাহকের। কিন্তু দুই হাজার ৪১১টি সেচ সংযোগের মধ্যে ৮০০টি মিটার বৈধ। বাকি এক হাজার ৬১১টি সেচ সংযোগ অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিক গ্রাহককে দিয়েছে পিডিবি। এসব সেচপাম্পে কোনো মিটার নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলে রয়েছে মিটার নম্বর। সেই কাল্পনিক মিটার নম্বরে বিল পরিশোধ করছেন কৃষক। তবুও বিল দিতে হচ্ছে বৈধ বিলের চেয়ে তিনগুণ বেশি অর্থাৎ ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।

কামরাবাদ ইউনিয়নের শুয়াকৈর গ্রামের বিদ্যুৎ গ্রাহক জবান আলীর সেচপাম্প আছে, কিন্তু মিটার নেই। তবুও বিদ্যুৎ বিলে রয়েছে মিটার নম্বর ৭৩৫৬২০৪৯। এই মিটার নম্বরে বিল দিতে হয়। ২০১৭ সালে পিডিবি অফিসে এসে সংযোগ বন্ধ করে বিল পরিশোধ করলেও চলতি মাসে বিল করেছে ৫৩ হাজার ৭৫১ টাকা। চর বড়বাড়িয়া গ্রামের আব্দুর মালেক সরকার মারা গেছেন ২০০০ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর পিডিবি কার্যালয়ে আবেদন করে সেচপাম্প বন্ধ রাখা হয়। ২০০৭ সালে তাঁর ছেলে শফিকুল ইসলামের নামে পিডিবি মামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে পুলিশের মাধ্যমে ফের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। হঠাৎ ২৫ বছর পর গত ২৯ অক্টোবর আব্দুল মালেক সরকারের নামে ৩০ হাজার ৫৭৫ টাকার নতুন বিল পাঠায় পিডিবি। ২৭ নভেম্বরের (আজ) মধ্যে বিল পরিশোধ করতে বলা হয়। যদিও তাদের নামে মিটার নেই, কিন্তু বিদ্যুৎ বিলে মিটার নম্বর ৭৩৫৪৪৬৫৭। আলাপকালে শফিকুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলার পিডিবির গ্রাহদের পাহাড় সমান বিপদ।

সামর্থবাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী এ এস এম আরিফ। তিনি জানান, ২০১৭ সালে সেচপাম্প বন্ধ করেছেন তিনি। বিল পরিশোধ করে আবেদন করেছেন আর সেচপাম্প চালাবেন না। তারপর আর সেচপাম্প চালাননি। হঠাৎ করে চলতি মাসে ১৪ হাজার ৩৪০ টাকা বিল করেছে পিডিবি। মিটার না থাকলেও বিদ্যুৎ বিলে মিটার নম্বর ৭৩৫৪২৪৭২ উল্লেখ করা হয়েছে। টাকা পরিশোধের কাগজ, সেচপাম্প বন্ধের আবেদনের সব কাগজ বিদ্যুৎ অফিসে নিয়ে গেলে কর্মকর্তারা জানান, সংযোগ বন্ধ হয়নি। এ এস এম আরিফের অভিযোগ, পিডিবি কর্মকর্তারা কেউ বেশি দিন থাকেন না। কিছু সংখক গ্রাহককে মামলায় ফেলে চুরির টাকা হজম করতে বন্ধ সংযোগে বিল বানিয়ে বদলি হয়ে যান। বিপদ শুধু গ্রাহকের। বিল পরিশোধ না করলেই মামলা, জরিমানা চারগুণ টাকা এবং জেলও খাটতে হয়।

সেচপাম্প চালু রাখতে অবৈধ লাইন নিয়ে তিনগুণ বিল পরিশোধ করে আসছেন গ্রাহকরা। এই বিল পরিশোধ করতে দেরি হলেই অবৈধ সংযোগের দায়ে পড়তে হয় পিডিবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রোষানলে। মামলা দিয়ে হায়রানি ও গ্রেপ্তার করা হয়। বিলের ছয়গুণ জরিমানা পরিশোধ করে আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হলে পায় মুক্তি। কিন্তু পিডিবি অফিসের ভেলকিবাজি বিলের কাজ বন্ধ হয় না।

বৈধ মিটার গ্রাহক আব্দুল মালেক, মিজানুর রহমান, বিপ্লব মিয়া জানান, মিটার নিয়ে সেচপাম্প চালালে এক মৌসুমে ছয়-সাত হাজার টাকা লাগে। তবে মিটার দিতে রাজি না পিডিবি। দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়ে যেভাবেই হোক মিটার নিয়েছেন তারা। এখন কার্ড মিটার চালান বলে অনেক টাকা সাশ্রয় হয়। অতিরিক্ত বিল গুনতে হয় না, পড়তে হয় না মামলায়, শুনতে হয় না হুমকি-ধমকি।

সরিষাবাড়ী উপজেলা বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের (পিডিবির) নির্বাহী প্রকৌশলী এ জেড এম আনোয়ারুজ্জামান। চলতি বছরই যোগদান করেছেন তিনি। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নানা জটিলতার কারণে গত কয়েক মাসেই তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। এসব বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, তিনি কিছু দিন আগে যোগদান করেছেন। বিষয়গুলো তাঁর জানা নেই। বিল নিয়ে জটিলতাগুলো খোঁজ নিয়ে দেখবেন তিনি। মিটারবিহীন সেচ সংযোগ কিভাবে দেন এবং গ্রাহকের গড় বিল করার কোনো নিয়ম আছে কী? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জে, চরাঞ্চলে সেচপাম্প দুই হাজার ৪১১টি। কিছু গ্রাহক বিদ্যুৎ লাইন বাইপাস করে সেচ চালায়। সব সেচপাম্পের খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই সব মিটার দেওয়া হয়নি। মিটার ছাড়া সব সেচ গ্রাহকদের গড় বিল করা হয়। সেচ চালুর সময় গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তিমতো বিল করা হয়। গ্রাহককে মিটার দিচ্ছেন না। তাদের বিলে একটি মিটার নম্বর আছে, এই মিটার নম্বর কোথায় পেলেন? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি সমকালকে উত্তর দিলেন, পিডিবির সঙ্গে সেচ গ্রাহকের মীমাংসাকৃত বিষয়। এ নিয়ে আর প্রশ্ন না করলে ভালো হয়। সামনের বোরো মৌসুমে সব ঠিক করে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×