ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘স্বাস্থ্যকর’ শহরের বাতাস সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর

‘স্বাস্থ্যকর’ শহরের বাতাস সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর
×

ধুলো উড়িয়ে চলছে যানবাহন, আর পথচারীরা মুখে হাত দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে চলেছেন। খুলনা মহানগরীর শিপইয়ার্ড সড়কে এ দৃশ্য নিত্যদিনের। এমন পরিবেশে শ্বাস নেওয়াও কষ্টসাধ্য। গতকাল বুধবার দুপুরে সমকাল

হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের পাঁচটি শহরকে ‘স্বাস্থ্যকর শহর’ হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২০ সাল থেকে কাজ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে এই প্রকল্পে জায়গা করে নিয়েছে দেশের দক্ষিণের ‘নির্মল বায়ু’র শহর খুলনা। এক সময় শান্ত-নিরিবিলি হিসেবে পরিচিত খুলনাই দেশের সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর শহরের শীর্ষ অবস্থানে ছিল গতকাল বুধবার।

বায়ুদূষণ নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের হিসাবে গতকাল সকাল ৮টায় খুলনার বায়ুমান ছিল ২৭৭, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। বায়ুমান ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকলে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হয়। 

বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরও প্রতিদিন বায়ুমান পরিমাপ করে। তাদের হিসাবে গত ১২ নভেম্বর সকাল ৯টায় খুলনার বাতাস ছিল দেশের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত। 

ওই দিন সকাল ৯টায় বায়ুমান ছিল ৩০৯; যা মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের পরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, শহরের পাশে প্রচুর ইটভাটা, সংস্কারহীন সড়ক, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, মেয়াদোত্তীর্ণ মোটরযান থেকে নির্গত বিষাক্ত ভারী ধাতুই দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে। বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি নগরীর সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, রূপসা স্ট্যান্ড মোড়, রূপসা সেতু সংযোগ সড়ক, গল্লামারী মোড়সহ কয়েকটি প্রধান সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, যানজটের পর মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে বাতাসের দূষণ নিয়ে। সড়কগুলোতে ধুলোর পরিমাণ এতই বেশি যে, একবার যাতায়াতের পর জামা-কাপড়ের রংই পাল্টে যায়। শিপইয়ার্ড, বাস টার্মিনাল সড়কে মাস্ক পরে চলাচলও এখন কষ্টকর। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নগরীর বয়রা মোড়ে বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র (ক্যামস) থেকে সার্বক্ষণিক বায়ুদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এক ঘণ্টা পর পর এটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। 

ক্যামসের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের ২৬ দিনের মধ্যে ১১ দিন বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর, দু’দিন ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং এক দিন ছিল ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, এক সময় খুলনাকে শান্ত নিরিবিলি নির্মল বায়ুর শহর বলা হতো। যারাই বেড়াতে এসেছেন খোলামেলা, দূষণমুক্ত পরিবেশের প্রশংসা করতেন। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কাজ, ইটভাটা, জৈব জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ নানা কারণে খুলনার সেই সুনাম আর নেই। সরকারি দপ্তরগুলোর ব্যর্থতায় খুলনা শহরটি দূষিত বাতাসের শহরে পরিণত হচ্ছে।   

খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন বলেন, বাতাসে বস্তুকণার পরিমাণ বাড়লে অল্পতেই মানুষ কাশি ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়। বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে। 

স্বাস্থ্যকর শহর প্রকল্পের ফোকাল পারসন ও খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবিরুল জব্বার বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নানা সূচক পরিমাপ করে খুলনাকে স্বাস্থ্যকর শহর প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রকল্পটি মূলত সুশাসন ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি। পাশাপাশি পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনা বাড়াতে জোর দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ বছরে আমরা ৫টি পুকুর সংস্কার, সোলার পার্কে দুটি উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার স্থাপন, ডিসপ্লে বোর্ড, সচেতনামূলক সাইকেল র‍্যালি, ডাস্টবিন প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। 

তিনি বলেন, বায়ুদূষণ কমাতে সংস্কারহীন সড়কে নিয়মিত পানি দেওয়া এবং বালু ও ইটবাহী ট্রাকগুলোতে ঢাকনা দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া নির্মাণ কাজেও নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার।

 

আরও পড়ুন

×