হস্তশিল্পে নারীদের এগিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তা সাদিয়া
দেওয়ানগঞ্জে নিজের হস্তশিল্প কারখানায় কর্মীদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তা সাদিয়া নেওয়াজ সমকাল
রাজ্জাক মিকা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৭ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিয়ের পর ভালোভাবেই চলছিল সাদিয়ার সংসার। একে একে ঘর আলো করে আসে দুই সন্তান। ধীরে ধীরে সংসারে দেখা দেয় অভাব-অনটন। শুধু স্বামীর আয়ে সংসার আর চলছিল না। তার ওপর সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবনা। এ অবস্থায় স্বজনদের পরামর্শে পোশাক তৈরি ও নকশার কাজ শুরু করেন সাদিয়া। প্রথম দিকে নানা শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন এই নারী উদ্যোক্তা। তিনি এখন দরিদ্র অনেক নারীর পথপ্রদর্শক।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার রেজাউল করিম খান ও রানু বেগম দম্পতির মেয়ে সাদিয়া পারভীন রুনা। ২০০২ সালে বিয়ে করে চলে আসেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কালিকাপুর বাজারীপাড়া শ্বশুরবাড়িতে। স্বামী আলী নেওয়াজ ছানা ওষুধ ব্যবসায়ী। দেওয়ানগঞ্জ বাজারে তাঁর ওষুধের দোকান। বিয়ের পর স্বামীর নামে নেওয়াজ শব্দটি নিজের নামের শেষে যোগ করেন সাদিয়া। পরিচিত হয়ে ওঠেন সাদিয়া নেওয়াজ নামে।
বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে এসে আর্থিক সচ্ছলতা দেখেছেন সাদিয়া। শ্বশুর আব্দুস সালাম ছিলেন পল্লী চিকিৎসক। স্বামী আলী নেওয়াজ ছানার ওষুধ ব্যবসাও ভালো চলছিল। সে কারণে চাকরি করার চিন্তাও করেননি সাদিয়া। কিন্তু সংসারের আর্থিক সচ্ছলতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ক্রমেই অভাব-অনটন বাড়তে থাকে। কোল আলো করে আসে মেয়ে নওসিন তাবাসসুম ও তাসলিমা তাবাসসুম। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সাদিয়া।
২০১৬ সালের শুরুতে ছোট ভাই আনোয়ার পারভেজ খান ও তাঁর স্ত্রী হাজেরা আক্তারের পরামর্শ ও উৎসাহে শুরু করেন হস্তশিল্পের কাজ। স্বামী আলী নেওয়াজের সহায়তায় প্রথমে বাজার থেকে তিনটি জামার কাপড় কিনে তার ওপর নকশি করেন সাদিয়া। জামা তিনটি ধুয়ে রোদে শুকাতে দেন। নজরে আসে ব্র্যাকের নকশি প্রকল্পের কর্মীদের। জামা তিনটি চার হাজার ২০০ টাকায় কিনে নেন তারা। এতে লাভ হয় দেড় হাজার টাকা। এরপর বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। গৃহিণী থেকে হয়ে ওঠেন ব্যবসায়ী। ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি। পুঁজি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায় তাঁর লোকবল। আশপাশের দরিদ্র পরিবারের বেকার নারীরা ছুটে আসেন তাঁর কাছে। জামালপুর থেকে কাপড় কিনে তাতে নকশি ছাপ দিয়ে চুক্তিতে কাজ করতে দেন ওই সব বেকার নারীদের। এ কাজ করে মাসে জনপ্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
বালুগ্রামের নারগিস বেগম জানান, সাদিয়া নেওয়াজ তাদের পথপ্রদর্শক। তাঁর হাত ধরে হস্তশিল্পের কাজে নেমে স্বাবলম্বী তারা।
ঝর্ণা আক্তার বলেন, হস্তশিল্প সম্পর্কে আগে কিছু জানতেন না তারা। সাদিয়া নেওয়াজ কাপড়ে নকশি ছাপ দিয়ে কীভাবে সেলাই করতে হয় তা শিখিয়ে দেন। এখন তারা বিভিন্ন ধরনের নকশির কাজ জানেন। প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন। সংসারের অভাব দূর হয়েছে।
দুই বছর স্থানীয়ভাবে হস্তশিল্পের কাজ করে কয়েক লাখ টাকা পুঁজি হয় সাদিয়ার। চিন্তা জাগে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির। জামালপুরের মোকাম ছেড়ে নরসিংদী, বাবুরহাট, ঢাকা থেকে কাপড় ও সদরঘাট থেকে সুতা পাইকারি কিনতে শুরু করেন। পাইকারি বাজার থেকে নিজে কাপড়, সুতা কিনে কর্মীদের দিয়ে নকশি করান। এরপর ধুয়ে শুকিয়ে বাজারজাত করেন। তাঁর পণ্য যায় চাঁদপুর, নরসিংদী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও ঢাকায়। খুচরা বিক্রির জন্য দেওয়ানগঞ্জ বাজারের উপকণ্ঠে আহম্মদ আলী মহিলা দাখিল মাদ্রাসার পাশে গড়ে তোলেন ‘দি সান ফ্যাশন হাউস’।
সাদিয়া নেওয়াজ বলেন, মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে তাঁর হস্তশিল্পের ব্যবসা শুরু হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানে এখন কর্মী সংখ্যা ১ হাজার ২০০ জনের ওপরে। বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্ডারও পাচ্ছেন। এখান থেকে তাঁর মাসিক আয় ন্যূনতম ৫০-৬০ হাজার টাকা।
দি সান ফ্যাশন হাউসের ব্যবস্থাপক কাজলী বেগম জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে নিজেদের তৈরি ওয়ান পিস, টুপিস, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, ফতোয়া, ৮ রকমের নকশিকাঁথা, ৭ রকমের বিছানার চাদর, ছোটদের জামা তৈরি ও নকশি সেলাই করে খুচরা ও পাইকারি দরে বিক্রয় করা হচ্ছে। কাজের গুণগত মান ভালো হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অর্ডার আসছে।
সাদিয়ার হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সবাই নারী। সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র নারীদের হস্তশিল্পে যুক্ত করেছেন সাদিয়া। এতে তাদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরছে।
বাজারীপাড়ার নারীকর্মী আনুফা বলেন, ‘আমাদের অভাবী সংসার। একার আয়ে সংসার চলে না। সাদিয়া আপা আমাদের হস্তশিল্পের কাজ শিখিয়ে ও কাজ দিয়ে আলোর পথ দেখিয়েছেন।’
সাদিয়া নেওয়াজের ভাষ্য, তিনি চান তাঁর মতো সবাই আয় করুক। সবার সংসার থেকে অভাব নামক শব্দটা দূর হোক। সব সময় অসহায় মানুষের পাশে থাকতে চান তিনি। ভবিষ্যতে ব্যবসার মুনাফাকে তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ ব্যবসার পুঁজি বৃদ্ধিতে এবং অন্য একভাগ কর্মীদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে। ব্যবসা যত বড়ই হোক, তাঁর প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রাধান্য থাকবে। এই ব্যবসা শুধু তাঁর একার উন্নয়নের জন্য নয়, অসহায় নারীদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্যও।
স্বামী আলী নেওয়াজ ছানা বলেন, নারী-পুরুষ মিলে সংসার। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা উপার্জন করলে সংসার চালানো সহজ হয়, সংসারের অভাব-অনটন থাকে না। সাদিয়ার এই উদ্যোগকে মনেপ্রাণে স্বাগত জানান তিনি। তাঁর চাওয়া ঘরে ঘরে সাদিয়ার মতো একজন নারী উদ্যোক্তার জন্ম হোক।
প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন জীবনের ভাষ্য, সাদিয়া নেওয়াজ কঠোর শ্রম ও নিরঙ্কুশ বুদ্ধি বিনিয়োগ করে আজ স্বাবলম্বী। তিনি শুধু নিজের সংসারের সচ্ছলতা ফিরে আনেননি, এক হাজার ২০০ কর্মীর পরিবারেও সচ্ছলতা এনেছেন। এমন নারী উদ্যোক্তা পরিবার, সমাজ ও জাতির গর্ব। সাদিয়া এ অঞ্চলের নারীদের আদর্শ।
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নূরে ফাতেমা জানান, সমাজে পুরুষদের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে নারীদের চাওয়া-পাওয়ার বৈষম্য সীমাহীন। সাদিয়া নেওয়াজ এই বৈষম্যকে মাড়িয়ে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন অন্য নারীদের। সাদিয়া নেওয়াজের মতো নারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে চেষ্টা করবেন তারা।
- বিষয় :
- হস্তশিল্প
- নারী উদ্যোক্তা
