ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পার্বত্য সমস‍্যা সমাধানে পথনকশা দিতে হবে

পার্বত্য সমস‍্যা সমাধানে পথনকশা দিতে হবে
×

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সমকাল প্রতিবেদক, রাঙামাটি থেকে

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষ সবার অংশগ্রহণ, অধিকার ও ইতিহাসের প্রতি সম্মান এবং স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের প্রতি মনোযোগ দিয়ে সমাধানের পথনকশা বের করতে হবে।

নাগরিক প্ল‍্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী উদ্যোগে আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় নাগরিকদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় ঝগড়া বিল এলাকার বার্গী লেক ভ‍্যালিতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের ভিতরে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তারা এটাকে কীভাবে কার্যকর করবেন। কীভাবে এই পথনকশা, ভূমি সংস্কার ও স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়টি মূল উপাদানের ভেতরে থাকতে পারে।
ড. দেবপ্রিয় আরও বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় এবং জাতিসত্তার মানুষগুলো আছে, তাদের পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা করতে হবে। এর ভিত্তিতে প্রতিনিধি হতে হবে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় সংহতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি এটার সমাধান না হয়, তাহলে জাতি ও দেশ হিসেবে আমরা দুর্বল হয়ে যাব।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশ একটা দোলাচলের মধ্যে আছে। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংস্কার, আবার এটা টেকসই করার জন্য গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা। রাজনৈতিক দলগুলো এই উত্তরণ সময়ে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করবে।

অন্যান্যদের বক্তব্য
সভায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য ও সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পার্বত‍্য চট্টগ্রামের সমস‍্যা পেয়েছি। এই সমস্যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সমাধান করে যেতে চাই। কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। কোনো অঞ্চলকে পেছনে ফেলে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়া যাবে না।

চাকমা রানী ইয়ান ইয়ান বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। তাঁর অভিযোগ, আদিবাসী বিরোধী তৎপরতা আরও বেড়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মনসুরুল হক বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যার যতটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন তাকে ততটুকুই নিরাপত্তা দিতে হবে। তিনি এই জনপদে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক অনুপম বড়ুয়া পার্বত‍্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে পথনকশা চেয়েছেন। তিনি ভূমি কমিশনকে সক্রিয় করার পরামর্শ দেন।
শতাধিক নাগরিকের অংশগ্রহণে সভায় নির্বাচন, সুশাসন ও দুর্নীতির বিষয় প্রাধান্য পেলেও অনেকে পার্বত্য শান্তিচুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করেছেন।
ব‍্যবসায়ী নেতা পল্লব চাকমা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন‍্য বাঙালি ও আদিবাসীদের সমন্বয়ে গড়া পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের জেলা সম্পাদক বখতিয়ার উদ্দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং কাপ্তাই হ্রদ দূষণমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। সমাজকর্মী নমিতা চাকমা ও খাগড়াছড়ির দয়াশিপ্রার দাবি, আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

শান্তি চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ
‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’– নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এমন প্রশ্নে বাঙালি ও আদিবাসী নাগরিকরা ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে পার্বত‍্য শান্তি চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ভোটারদের একটি অংশ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলেও আরেকটি অংশ তা বাতিলের দাবি তুলেছেন।

এ সভায় রাঙামাটির নাগরিকরা সংস্কার ও আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথাও ভোটাধিকারের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাদের প্রত্যাশা– অবৈধ অস্ত্রমুক্ত পাহাড়, ভূমি সমস‍্যার সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা। নাগরিকদের ভোটে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, কালো টাকা ও সেনা মুক্ত নির্বাচন, দুর্গম এলাকায় ভোট ডাকাতি বন্ধ, অযোগ্য নেতাকে লাল কার্ড দেখানো, নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই পরামর্শ সভা সঞ্চালন করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। সংস্কার হচ্ছেও। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোতে সংস্কার হচ্ছে না। কিন্তু কেন? রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনও পরিবারতন্ত্র চলছে।
স্থানীয় নাগরিকরা সভায় পার্বত‍্য জেলা রাঙামাটির বিভিন্ন সমস‍্যা তুলে ধরে সমাধান চেয়েছেন। কেউ কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও সেনাক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করলেও তা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সভার সূচনা বক্তব্যে বলেছেন, ৯০ দশকে সামরিক সরকার বদল হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারও পালাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু অনেক সময়ই সব পরিবর্তন সঠিকভাবে রূপায়িত হয় না। তাই পরিবর্তনকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×