ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে চিকুনগুনিয়া

জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে চিকুনগুনিয়া
×

চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চসিক ও এআরএফ পরিচালিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ছবি-সমকাল

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৫ | আপডেট: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:৪৫

চিকুনগুনিয়া এখন কেবল একটি সাময়িক জ্বরের রোগ নয়; এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে। এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ভুল রোগ নির্ণয় ও পর্যাপ্ত রিপোর্টিংয়ের অভাবে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা অজানা থেকে যাচ্ছে। 

গতকাল রোববার চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ) পরিচালিত ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের সার্বিক পরিস্থিতি, জনস্বাস্থ্যে প্রভাব, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ভাইরাসের জিনোমের স্বরূপ উন্মোচন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফলে এসব তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় চট্টগ্রামের এক হাজার ৭৯০ রোগীর ক্লিনিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। 

গবেষণায় বলা হয়, গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ রোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ এলাকা এবং সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা এলাকায় সংক্রমণের উচ্চমাত্রা পরিলক্ষিত হয়েছে। চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়া দ্রুত বিস্তার করা একটি মশাবাহিত রোগ হিসেবে জনস্বাস্থ্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। 

অনুষ্ঠানে চসিক মেয়র বলেন, নগর এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মশার প্রজননস্থল, মৌসুমি বায়ু ও জলবায়ুগত প্রভাব, নগরের অবকাঠামো এবং মানুষের আচরণ বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ না করলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না। 

চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ওই বিশেষ গবেষণা পরিচালিত হয়। এসপেরিয়া হেলথ কেয়ারের সহযোগিতায় এবং তত্ত্বাবধানে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএসটিসি, অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ, সিকুয়েন্সিং অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব চিটাগংয়ের (এনরিচ) গবেষকরা। এতে চসিক ও বিভিন্ন উপজেলার রোগীদের ক্লিনিক্যাল, জনস্বাস্থ্য, রোগতত্ত্ব এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ওপর বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করা হয়।

ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত ১৮ থেকে ৩৫ বয়সীরা 

গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক রোগী সতর্কতামূলক লক্ষণসহ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী গুরুতর ডেঙ্গুতে ভুগেছেন। উপসর্গ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব রোগীরই জ্বর ছিল। পাশাপাশি বমিভাব, মাথাব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ উচ্চ হারে উপস্থিত ছিল। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। পুরুষ রোগীর সংখ্যা নারীদের তুলনায় বেশি। শহরাঞ্চলের মানুষ গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। 

গবেষণায় উঠে আসে, চিকুনগুনিয়ার সঙ্গে ডেঙ্গু (১০ শতাংশ) ও জিকা (১ দশমিক ১ শতাংশ) একযোগে সংক্রমণ চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর আগে পাকিস্তান, ভারত ও থাইল্যান্ডে শনাক্ত হওয়া ভেরিয়েন্টের সঙ্গে এ ভেরিয়েন্টের মিল থাকলেও চট্টগ্রামে পাওয়া ভাইরাসে অর্ধশতাধিক জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন বিদ্যমান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর গবেষণা চলমান রয়েছে।

গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক এইচএম হামিদুল্লাহ মেহেদী, রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ নুরুদ্দিন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নান। 

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ও প্রিন্সিপাল ডা. জসিম উদ্দিন, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এমএ সাত্তার, হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইবরাহিম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. একরাম হোসাইন। 

অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নান বলেন, ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে একাধিক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন শনাক্ত করেছি, যা এই অঞ্চলে রোগের বিস্তার ও তীব্রতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব তথ্য ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে কাজে দেবে।

আরও পড়ুন

×