কারা হেফাজতে প্রলয় চাকীর মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ
প্রলয় চাকী
সমকাল প্রতিবেদক ও পাবনা অফিস
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চিকিৎসা অবহেলায় কারা হেফাজতে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও সংগীতশিল্পী প্রলয় চাকী (৬০) মারা গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। গত রোববার রাত ৯টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
প্রলয় চাকীর পরিবার বলছে, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন তিনি। কারা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকাকালীন প্রলয় যথাযথ চিকিৎসা পাননি।
এদিকে, প্রলয় চাকীর মৃত্যুতে পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নব্বই দশকের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক ছিলেন। পাবনার বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রে নিয়মিত সংগীত পরিচালনা করছিলেন তিনি। প্রলয় ও তাঁর ভাই মলয় চাকী বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘ইত্যাদি’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১০৭ জন এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫।
পাবনার বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, প্রলয় চাকী রাজনীতির বাইরে একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিল্পী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। সাংস্কৃতিক কর্মীর এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। তাঁর জীবনসত্তার মধ্যে সংস্কৃতি ও সংগীত লুকিয়ে ছিল। এই অভাব কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
প্রলয় চাকীর ছেলে সানি চাকী বলেন, আমার বাবা আগে থেকে হার্টের রোগী ছিলেন। হার্ট অ্যটাকে আক্রান্ত হওয়ার পরও সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে ভর্তির কথাও আমাদের জানানো হয়নি। হাঁটাচলা নিষেধ থাকলেও তাঁকে দিয়ে কারাগারে নানা কাজ করানো হতো। কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সঠিক চিকিৎসার অভাবেই আমার বাবার মৃত্যু হয়েছে। বাবার মৃত্যুর সঠিক তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
পাবনা জেলা কারাগার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর সকালে পাবনা শহরের পাথরতলা এলাকার নিজ বাড়ি থেকে প্রলয় চাকীকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাঁকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
তাঁর ভাই মলয় চাকী বলেন, সঠিক চিকিৎসা পেলে এই মৃত্যু এড়ানো যেত। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে না রেখে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় তাঁকে। রাজশাহী মেডিকেলে নেওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা সিসিইউ ওয়ার্ডের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় ২০০ বছর পাবনায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ করছে। আমাদের জীবনটা ছিল সাংস্কৃতিক ও সংগীত ঘিরে। সংগীতশিল্পী তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, দিনাত জাহান মুন্নী, বাপ্পা মজুমদার, কবির বকুল ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ আরও অনেকে প্রলয় চাকীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
পাবনা জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, প্রলয় চাকী ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। শুক্রবার সকালে কারাগারে থাকাকালে তিনি হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁকে দ্রুত পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়।
স্বজনরা জানান, দুই বছর আগে স্ত্রী হারানোর পর ছেলে সানি চাকী ও মেয়ে পুনম চাকীর সঙ্গে বসবাস করতেন প্রলয় চাকী।
এদিকে, গতকাল সোমবার প্রলয় চাকীর মরদেহ নিজ বাড়িতে আনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজন, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমায়। সন্ধ্যায় পাবনা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
পাবনা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে প্রলয় চাকী ছিলেন একজন আপাদমস্তক সাংস্কৃতিক কর্মী। সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
পাবনা সদর থানার ওসি সঞ্জয় কুমার সাহা বলেন, পাবনা শহরের জুগিপাড়া এলাকার সুজন হোসেন নামে একজনের দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে প্রলয় চাকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘর্ষের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে ওই মামলা হয়েছিল।
তবে প্রলয় চাকীর স্বজনরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না। এ জন্য তিনি বাড়িতে থাকতেন। পরিবারের লোকজন তাঁকে নিরাপদ জায়গায় যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
- বিষয় :
- মৃত্যু
- পাবনা
- প্রলয় চাকী
- আসক
