ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ ক্ষতির মুখে ফল ও ফসল

প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ ক্ষতির মুখে ফল ও ফসল
×

ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নে একটি চাতালে প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে চলছে ধান সেদ্ধ করার কাজ। শুক্রবার তোলা ছবি সমকাল

 সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা) 

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পলিথিন, পুরোনো টায়ার, পুরোনো রাবার, জুতা-স্যান্ডেলসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে। এতে করে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়েছে। বাণিজ্যিকভাবে ধান সেদ্ধ করার এই কাজ চলছে উপজেলার বিভিন্ন চালকল ও চাতালে।

স্থানীয়রা জানান, ব্যস্ত সড়কের পাশে ও আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এসব চাল কল ও ধান শুকানোর চাতালে রয়েছে বড় বড় চুলা ও বয়লার। সচরাচর তুষগুঁড়া ব্যবহার করে সেখানে ধান শুকানো ও সেদ্ধ করা হয়। সম্প্রতি এসব প্রাকৃতিক উপাদানের পরিবর্তে ধান সেদ্ধ করার কাজে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিভিন্ন চাতালের আশপাশে বসবাসকারীদের ভাষ্য মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর কারণে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। চাতাল ও বয়লারের চুলা থেকে ছাই উড়ে গিয়ে পড়ছে ফসলের জমিতে। এতে নষ্ট হচ্ছে ফল-ফসল ও শীতকালীন বিভিন্ন সবজি। কালো ধোঁয়ার কারণে সড়কে চলাচলরত যানবাহন ও পথচারীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে চাতাল ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ করছেন না। উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলতলা, পাকুড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে দিনের বেলায় ধানের তুষ বা গুঁড়ার বদলে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা-স্যান্ডেল পুড়িয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল ইসলাম জানান, কালো ধোঁয়ার সঙ্গে টায়ার, পলিথিন ও রাবার পোড়ানোর দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা দায়। চাতাল মালিকদের ভাষ্য, ধানের তুষ পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করতে ব্যয় বেশি হয় আর এসব বর্জ্য জ্বালিয়ে সেদ্ধ করতে ব্যয় কম।

কৃষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন গ্রামে বিশেষ করে পাকুড়িয়ায় বেশ কয়েকটি ধান-চালের চাতাল থেকে উড়ে আসা ধোঁয়া ও ছাইয়ে জমিতে রোপণ করা সবজি প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপজেলার দাশুড়িয়া তেতুঁলতলা এলাকার মাঠে খিরা, ভুট্টা, সরিষা, ধনিয়া, গম, লালশাক, ফুলকপিসহ বিভিন্ন সবজির মাঠে চাতালের ছাই উড়ে এসে পড়ার কারণে এসব এলাকার ফসলে ফলন কমেছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাহাবুল ইসলাম।

এদিকে টায়ার পোড়ানো ছাই উড়ে আশপাশের গাছগাছালি ও বাড়িঘরের টিনের চালায়, এমনকি ঘরের আসবাব, বিছানা ও পোশাকে আস্তরণ পড়ে যায়। প্রতিনিয়ত এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, মিল চাতালের মালিকদের এসব বিষয়ে বললেও তারা তাদের কথার কোনো গুরুত্ব দেন না।
পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ পৃথিবী ঈশ্বরদী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলেজ শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বাবু বলেন, পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা, স্যান্ডেলসহ প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে সেদ্ধ করা ধানের চাল মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বর্জ্য পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উপজেলার সাধারণ সম্পাদক সহিদ মাহমুদ বলেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে প্রতিনিয়ত এভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। পরিবেশের জন্য এসব বর্জ্য পোড়ানো কালো ধোঁয়া মানব দেহের জন্য যেমন ক্ষতির কারণ, তেমনি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত এবং গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের অনুরোধ জানান। 
দাশুড়িয়ার পাকুড়িয়া গ্রামের চাতাল মালিক মো. আব্দুল খালেক তাঁর ধানের চাতালে ধান সেদ্ধ করছেন পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা-স্যান্ডেল ও বিভিন্ন কারখানার ফেলে দেওয়া বর্জ্য জ্বালিয়ে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ধানের গুঁড়া বা তুষ জ্বালিয়ে ধান সেদ্ধ করতে খরচ বেশি, সে কারণে কম দামে পলিথিন, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে। ঈশ্বরদী ইপিজেড, রূপপুর প্রকল্প থেকে ফেলে দেওয়া এসব বর্জ্য কম দামে তারা সংগ্রহ করেন বলে জানান। চাতাল শ্রমিক রমজান আলী বলেন, মিল মালিকরা এসব জ্বালানি তাদের এনে দেন। তা দিয়ে ধান সেদ্ধ করেন তারা। এখানে শ্রমিকদের দায় নেই। 

এসব বিষয়ে পাবনার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (দপ্তরপ্রধান) মো. আব্দুল গফুর সমকালকে বলেন, ধানের মিল ও চাতাল মালিকরা যারা গোপনে পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা স্যান্ডেল পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন সেসব চাতালে অচিরেই অভিযান চালানো হবে। 
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান সমকালকে বলেন, যেসব চাতালের বয়লারে পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা-স্যান্ডেল পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে সেসব চাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এর আগে প্রতিবারই জনপ্রতিনিধিরা পৌর এলাকার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু মুনাফা লুটেছে সংশ্লিষ্টরা। সময় মতো কাজ করা হলে পৌর এলাকার বাসিন্দারা আরও বেশি সেবা পেতো। বর্তমান প্রশাসন একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে। তারা চান আগামীতে এই চর্চা অব্যাহতত থাকুক। আর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাসিন্দারাও যেন যত্ন করেন।

আরও পড়ুন

×