ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় পতিত জমিতে আলোর হাতছানি, আলোকিত হবে মুক্তাগাছা, কমবে চুরি ছিনতাই
ছবি: সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় একটি সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানি সেখানকার মানুষদের আলোর হাতছানি দিচ্ছে। স্থানীয় পতিত জমি থেকে তারা আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। বিদ্যুৎহীন গ্রামগুলো আলোকিত হবে– এমন আশায় আছেন তারা। জুলস পাওয়ার লিমিটেড (জেপিএল) সেখানে ২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে অবদান রাখার সম্ভাবনা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।
কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহযোগিতায় মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড (এমএসইএল) নামে ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জেপিএল।
মুক্তাগাছা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, মুক্তাগাছা উপজেলায় শীত মৌসুমে ৩০ মেগাওয়াট এবং গরমের মৌসুমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এমএসইএলের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে লোডশেডিং কমে আসবে; উপকৃত হবে মুক্তাগাছাবাসী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উপজেলার নিমুরিয়া গ্রামের ৭৪ একর জমির ওপর ২০২৫ সালের মে মাসে ২০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট তৈরির কাজ শুরু হয়। এলাকাটি জলাবদ্ধ এবং দুর্গম হওয়ায় এসব জমি কৃষি বা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতো না।
জুলস পাওয়ার লিমিটেডের (জেপিএল) সহযোগিতায় প্রকল্পটি ২২ বছরের জন্য বার্ষিক লিজ নিয়ে নির্মিত হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জমি ভরাট না করে পিলারের ওপর স্ট্রাকচার করে সোলার প্যানেল, ইনর্ভাটার, ট্রান্সফরমার এবং ভাসমান ফ্লোটারের ওপর কেবল বসিয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই সৌরবিদ্যুৎ চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বছরে ৩৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং ২৪ হাজার ৩৪৪ টন কার্বন নিঃসরণ এড়াবে।
জেপিএল কর্মকর্তা মো. মেহেদুল ইসলাম বলেন, এই অনুর্বর, পতিত জমির মালিকরা এতদিন এই জমি থেকে কোনো উপকার পেতেন না। এমনকি, জমির বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার মতো অর্থও উপার্জন হতো। এখন প্রতিবছর ভাড়ার টাকা পাবেন। এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। বর্তমানে ২০০ জনের অধিক স্থানীয় কর্মী এই প্রকল্পে কাজ করছেন। উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রকল্পের কারণে এলাকার জনবসতির এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদনশীল শিল্প কলকারখানা স্থাপন বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন। এতে করে এলাকায় চুরি ছিনতাই কমে যাবে। দিনের বেশির ভাগ সময় তারা লোডশেডিংয়ে পড়েন। এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে বিদ্যুৎ সমস্যা থাকবে না বলে আমরা আশা করছি।
আব্দুল মালেক নামে একজন জমির মালিক বলেন, জলাশয় ও কচুরিপানার মাঝে আমার জমি, তাই সেটি পতিত থাকত। সে জন্য আগে আমি জমি কোনো কাজে লাগাতে পারতাম না। এই পরিত্যক্ত জমি থেকে কোনো আর্থিক সুবিধাও পেতাম না। বর্তমানে জমি লিজ দিয়ে প্রতিবছর ভাড়ার টাকা পাব। এতে আমার পরিবারের জন্য একটি বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হবে।
রঘুনাথপুরের ৫০ বছর বয়সী কৃষক মাহাবুবুল আলম কাজল বলেন, আমার ২২০ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি রয়েছে, উৎপাদনশীল করার বারবার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনুর্বর, আগাছা, কচুরিপানা এবং মশায় ভরা ছিল। তিনি বলেন, এই জমিটি কয়েক দশক ধরেই অব্যবহৃত ছিল, এখান থেকে কোনো আয় আসেনি। এখন এই সৌর প্রকল্পের জন্য এটি লিজ দিয়ে আমি আমার পরিবারের বার্ষিক খরচ মেটাতে পারব।
৪৭ বছর বয়সী আরেক স্থানীয় কৃষক আব্দুল হান্নানেরও একই অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর পানির নিচে থাকা জমি নিয়ে। অনুৎপাদনশীল জমি থেকে এখন বাড়তি আয়ের সুযোগ হচ্ছে।
এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কেবল স্থানীয় পরিবারের জন্য নয়, জাতীয় গ্রিডের জন্যও একটি স্থিতিশীল, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস প্রদান করে পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ময়মনসিংহে ২০ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেডের (এমএসইএল) সঙ্গে দুই কোটি ৪৩ লাখ ডলারের চুক্তি সই করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ২৯১ কোটি ২১ লাখ সাত হাজার ৫৫৩ টাকা। এডিবি জানায়, মুক্তাগাছা সোলারটেকের জন্য অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সিন্ডিকেট করেছে সংস্থাটি। এটি বাংলাদেশভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানি জুলস পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, এ ঋণের মধ্য এডিবি থেকে দেওয়া হবে এক কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং এডিবি পরিচালিত লিডিং এশিয়ান প্রাইভেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড-২(এলইএপি-২) থেকে দেওয়া হবে ৮৮ লাখ ডলার।
এ প্রকল্পের অধীনে ২০ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের সমর্থনপ্রাপ্ত দেশের প্রথম বেসরকারি খাতের ইউটিলিটি-স্কেল সৌর স্থাপনার একটি। এডিবি বেসরকারি সেক্টর অপারেশনের পরিচালক সুজান গ্যাবরি বলেন, এডিবির অর্থায়নের লক্ষ্য বাংলাদেশের অগ্রগতি ও টেকসই জ্বালানি সমাধানকে এগিয়ে নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদি এই অর্থায়ন নবায়নযোগ্য প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ মূলধন চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, এডিবি জেপিএলকে সহযোগিতা করতে পেরে আনন্দিত। এটি টেকসই সমাধানের অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে অগ্রণী দক্ষতা ও উদ্ভাবনে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ৮.১২ টাকায় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ২১৫ মেগাওয়াটের মাত্র ৪.৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে, এর মধ্যে সৌরশক্তি ৮০ শতাংশ। সরকার দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশে বৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য বেসরকারি খাতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন।
- বিষয় :
- মুক্তাগাছা
