ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৪৭ বছর পর মন্ত্রীবিহীন শেরপুর

৪৭ বছর পর মন্ত্রীবিহীন শেরপুর
×

 দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার পরে সব সরকারের আমলেই শেরপুর থেকে কেউ না কেউ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার পদ পেয়েছেন। কিন্তু এবার তার ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় নেই শেরপুরের কেউ। তবে জেলার তিনটি আসনের মধ্যে একটিতে নির্বাচন স্থগিত থাকায় এখনও আশা রাখছেন জেলাবাসী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপর-১ (সদর) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর হাফেজ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ। এই আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আতিউর রহমান আতিক। তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সরকারি দলের হুইপ ছিলেন। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তাঁকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানুয়ার হোসেন ছানু।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শেরপুর-২ (নকলা ও নালিতাবাড়ী) আসন থেকে প্রথমবার নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরী। এই আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরী ১৯৯৬ সালে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন বিএনপির জাহেদ আলী চৌধুরী। তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারি দলের হুইপ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অবশ্য ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও মতিয়া চৌধুরী জয়ী হয়ে কৃষিমন্ত্রী হন। তিনি ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা ছিলেন।
এর আগে ১৯৭৯ সালে শেরপুর সদর (তৎকালীন জামালপুর জেলার-৬ আসন) থেকে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী প্রয়াত খন্দকার আব্দুল হামিদ। তিনি প্রথমে যুব উন্নয়ন ও সাত্তার সরকারের সময় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা, শ্রমশক্তি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করলে নালিতাবাড়ীর বাসিন্দা প্রয়াত জাপা নেতা অধ্যাপক আব্দুস সালাম প্রথমে স্বরাষ্ট্র উপমন্ত্রী ও পরে ১৯৮৬-১৯৯০ সাল পর্যন্ত কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অধিকাংশ সময় শেরপুরে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ছিলেন।

কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে শেরপুরের কেউ মন্ত্রিত্ব পাননি। তবে জেলাবাসীর প্রত্যাশা শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল নির্বাচিত হলে হয়তোবা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা হুইপের মতো পদ পেতে পারেন। কারণ, তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্নেহভাজন। এই আসনে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে জয়ী হন বিএনপির প্রয়াত নেতা ডা. সেরাজুল হক। ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচন ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় 
সংসদ নির্বাচেনে জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে এই আসনের ভোট স্থগিত রয়েছে। এবার হক পরিবারের সদস্য প্রয়াত এমপি সেরাজুল হকের জ্যেষ্ঠপুত্র মাহমুদুল হক রুবেলকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি।

জানা গেছে, শেরপুরের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। যদিও ভারতীয় রাজ্য মেঘালয়ঘেঁষা এই জেলার পর্যটনখাত সম্ভাবনাময়। রয়েছে একটি স্থলবন্ধর। ব্যবসা ও পর্যটনকে পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষ্যে যাতায়াতের সুবিধার্থে এই জেলায় রেলপথ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ আমলে জামালপুর-রাংটিয়া রেলপথ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৪ সালের ৮ জুন তৎকালীন রেলমন্ত্রী শেরপুরে রেলপথ স্থাপনের ঘোষণা দেন।  জামালপুর থেকে শেরপুর জেলা শহরে ২৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জরিপ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই ঘোষণার এক যুগ পরও রেলপথ স্থাপনে অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন জেলাবাসী। আশপাশের জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হলেও বঞ্চিত হচ্ছে শেরপুর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীই রেলপথ, মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আশ্বাস দিয়েছেন। বিশেষ করে সদরের পরাজিত বিএনপি প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা নির্বাচনী প্রচারে জোর দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। তাই ধানের শীষ প্রতীক জয়ী হলে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে। তা না হলে অধরাই থেকে যাবে জেলাবাসীর স্বপ্ন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও সদরে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় সব আশা দুরাশায় রূপ নিয়েছে। উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন জেলাবাসী।
নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে অনেকের আশা ছিল প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর ছেলে শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তাঁর জায়গা হয়নি।

শেরপুর সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদের ভাষ্য, তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছেন, সবার ওপরে দেশ। তাই তিনি যদি দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চান তাহলে শেরপুর সদরে বিএনপির এমপি না থাকলেও যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, এই জেলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলে শিক্ষা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। প্রান্তিক জেলা হওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে হয় অন্য জেলায়। এতে আর্থিক সংকটসহ নানা বিড়ম্বনায় পড়েন তারা। তাই এই জনপদের উন্নয়নের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রেলপথ ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন জরুরি।

শেরপুর নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি ও বিএনপি নেতা আশরাফুন্নাহার রুবি বলেন, দাবি বাস্তবায়নে কিছুটা শঙ্কার জায়গা থাকলেও তিনি আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব জেলার সমঅধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করেই উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বিশ্বাস করেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী ও সদরের বিএনপি প্রার্থী ডা. প্রিয়াঙ্কা সম্মিলিতভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রেলপথ মন্ত্রীর কাছে শেরপুরের মানুষের দাবিগুলো উপস্থাপন করবেন।
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহীনের ভাষ্য, শেরপুরে ১৬ লাখ মানুষের জন্য ২৫০ শয্যার একটি মাত্র হাসপাতাল রয়েছে। সেটিও বাস্তবিক অর্থে পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। তিনি বলেন, ২৫০ শয্যা বাস্তবায়নের পর অবশ্যই মেডিকেল কলেজের জন্য পত্র পাঠানো হবে। কারণ জেলার ১৬ লাখ মানুষের বাইরেও জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার মানুষ শেরপুরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন। এই জেলায় মেডিকেল কলেজের ভীষণ প্রয়োজন।  

শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বলেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এখনও চলে যায়নি। তিনি সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার ওপর দিয়ে মহাসড়ক রয়েছে। তাঁর ইচ্ছে রয়েছে, ওই সড়কের পাশ দিয়ে যেন জামালপুরের পিয়ারপুর থেকে একটি রেলপথ শেরপুরের স্থলবন্দর পর্যন্ত স্থাপিত হয়। তিনি বলেন, আসলে রেলপথ নির্মাণের আগে দেখতে হবে নাকুগাঁও স্থলবন্দর ঠিকঠাকমতো কাজ করছে কিনা।
শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম রাশেদের ভাষ্য, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি কোনো শঙ্কা দেখছেন না। উন্নয়ন পরিকল্পনা যেমন তাঁর আছে, একইভাবে সরকারেরও রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক যোগাযোগ করে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে আশা তাঁর। শেরপুর-২ আসনের এমপি ফাহিম চৌধুরীকে ইতিবাচক মানুষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফাহিম ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, শেরপুর অবহেলিত। সবাই মিলে এক সঙ্গে উন্নয়নের কাজ করব।
 

আরও পড়ুন

×