ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

বিকট বিস্ফোরণে উড়ে যায় দরজা, দগ্ধ ৯ জনই আশঙ্কাজনক

চট্টগ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

বিকট বিস্ফোরণে উড়ে যায় দরজা, দগ্ধ ৯ জনই আশঙ্কাজনক
×

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে উড়ে গেছে দরজা (ছবি-মো. রাশেদ)

চট্টগ্রাম ব্যুরো 

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৪৪ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:২১

চট্টগ্রাম নগরের হালি শহরে একটি বাসায় বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ নয়জন দগ্ধ হয়েছেন। সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে হালি শহর আবাসিক এলাকার এইচ ব্লকের ১ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে।

দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন—শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), মো. আইমান (৯), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)। দগ্ধদের মধ্যে রানী, পাখি ও সাখাওয়াতের শরীর শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া শিপনের ৮০, সুমন ও শাওনের ৪৫, আইমান ও আনাছের ২৫, আয়েশার শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শুরুতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। 

জানতে চাইলে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন,‘দগ্ধ নয়জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

বিস্ফোরণে ফ্ল্যাটটির দরজা উড়ে গেছে। জানালার কাচ ভেঙে গেছে। গ্রিল বেঁকে গেছে। পুরো বাসার অধিকাংশ জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। এছাড়া ভবনটির অন্য ১১টি ফ্ল্যাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ ফ্ল্যাটের দরজা ও জানাল ভেঙে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ধারণা- রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাসে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।   

চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এইচ ব্লকের ১৮ নম্বর বাড়ির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী দিদারুল আলম। ছয়তলা ভবনটিতে আছে ২২টি ফ্ল্যাট। প্রতি তলায় চারটি করে ফ্ল্যাট রয়েছে। তিনতলার একটি ফ্ল্যাট বছর দেড়েক আগে ভাড়া নেন শাখাওয়াত হোসেন। হালি শহর এলাকায় তার গ্যারেজ রয়েছে। বাসাটিতে দুই সন্তান, স্ত্রী ও গ্যারেজের এক কর্মচারীসহ পাঁচজন থাকতেন। কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য তার প্রবাসী ছোট ভাই পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে এলে তার দবাসায় উঠেন।

কি ঘটেছিল সেখানে
শাখাওয়াত হোসেনের মুখোমুখি ফ্ল্যাটটি আবিরদের বাসা। সেহেরি খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে যান। সেখান থেকে বের হতেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পান তিনি। আবির বলেন,‘ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের ঝাঁকুনিতে দাঁড়ানো থেকে পড়ে যায়। আমাদের বাসার মূল দরজা এসে ফ্রিজের সঙ্গে সজোরে আঁচড়ে পড়ে। সম্বিত ফিরে পেয়ে বের হয়ে দেখি পাশের বাসার লোকজন শরীরে আগুন নিয়ে বের হচ্ছেন। তাদের ঘরের ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’

বিস্ফোরণ হওয়া ফ্ল্যাটটির পাশের ফ্ল্যাটে শামীমা আক্তার তমার ‘তমা বিউটি পার্লার’। তিনি জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখেন বাসার দরজা উড়ে এসে তার পার্লারের আলমারি ও শোকেসের কাচ ভেঙে গেছে। চিৎকার শুনে দরজায় গিয়ে দেখেন পাশের বাসার ভেতর আগুন জ্বলছে এবং ঘরের লোকজন দৌঁড়ে বের হচ্ছেন। বের হওয়ার সময় তাদের শরীরেও আগুন জ্বলতে দেখা যায়। তমার ধারণা, সেহেরি খাওয়ার সময়ই বিস্ফোরণ ঘটে। 

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, তিনতলার বাসাটির অধিকাংশ জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। বাসার দরজা-জানালার অস্তিত্ব নেই। বাসার ড্রয়িং রুমে সোফায় খাবারসহ প্লেট পড়ে আছে। বাসাটির আসবাবপত্র কিছু অক্ষত, কিছু পুড়ে গেছে। বাসার ফ্যান ও জানালার গ্রিলগুলো বেঁকে গেছে। পাশে তিনটি ও নিচতলার চারটি ফ্ল্যাটের কোনটির দরজা অক্ষত নেই।

শরীরে আগুন নিয়ে নেমে আসছিলেন এক নারী
ভোর ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়িঘর ধোঁয়া ও ধুলায় ঢেকে যায়। একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে সিঁড়ির দিকে উড়ে আসে এবং আশপাশে কাঠ ও কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন বাসিন্দাকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে এক নারীকে শরীরে আগুন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখা যায়। তার পোশাকে আগুন জ্বলছিল এবং তিনি দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় অন্যরা আতঙ্কিত অবস্থায় ছুটে আসেন। পরে অন্য ফ্ল্যাটের কয়েকজন পুরুষকে এগিয়ে এসে তাদের সহায়তা করতে দেখা যায়। ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও আতঙ্কে নেমে আসে।

জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের ধারণা ফায়ার সার্ভিসের
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স আগ্রাবাদ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, বিস্ফোরণের পর ওই বাসায় আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা দগ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওই বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো না। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাস সংযোগ রয়েছে। ধারণা করছি, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রান্নাঘরে জমে ছিল। চুলায় আগুন দিতে গিয়ে গ্যাসের বিস্ফোরণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।’

বাড়িটির মালিক দিদারুল আলমের পরিবার থাকেন একই আবাসিকের জি ব্লকে। খবর পেয়ে তিনি ছুটে আসেন। তার দাবি, ভবনের গ্যাস লাইনে কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল না। তারা সবসময় মেরামত করেন। ফায়ার সার্ভিসও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তার ধারণা- ভাড়াটিয়ারা চুলা খোলা রেখেছিলেন, যাতে গ্যাস বের হয়ে জমে যায়। 

ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক সম্রাট বলেন, ‘ভবনের পকেট গেট খুলে দিয়ে সেহেরি খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ। মনে হয়েছে ভবনটি ভেঙে পড়ছে। এর পরপর শরীরের আগুন নিয়ে লোকজন নিচে নামতে থাকে।’

আরও পড়ুন

×