‘আমার আর মেয়ের পৃথিবীতে কেউ রইল না’
দেড় বছরের শিশুকন্যা মরিয়মকে বুকে জড়িয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন রুমি আক্তার
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ | ২০:১৩ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ | ০৯:৫৯
দেড় বছরের শিশুকন্যা মরিয়মকে বুকে জড়িয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন রুমি আক্তার। ঈদের আগে আসতে পারেননি বলে ঈদের দিন রাতেই ঝিনাইদহ থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে ছুটে আসছিলেন তার স্বামী জুহাদ বিশ্বাস। উদ্দেশ্য ছিল আদরের মেয়ের মুখ দেখা। কিন্তু সেই দেখা আর হলো না। অরক্ষিত রেলগেট এবং চরম অবহেলা নিমিষেই কেড়ে নিল জুহাদের প্রাণ, আর তছনছ করে দিল রুমির সাজানো সংসার। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রুমি আক্তারের হাহাকার, ‘আমার আর মেয়ের তো পৃথিবীতে কেউ রইল না।’
রুমির মতো এমন আরও ১১টি পরিবারের ঈদ আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। শনিবার রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে ঘটে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস গভীর রাতে পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের সঙ্গে বাসটির প্রচণ্ড জোরে সংঘর্ষ হয়। চলন্ত ট্রেনটি বাসটিকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে টেনে নিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জুহাদসহ ১২ জন বাসযাত্রী। আহত হন আরও অন্তত ১৫ জন।
ঘটনাস্থলে তদন্তে আসা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক পরিদর্শক জানান, আহতদের বক্তব্য ও প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে ঘটনার সময় গেটম্যান গেট ফেলেননি। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে বাসটি রেললাইনে উঠে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত গেটম্যান পালিয়ে যান।
কর্তব্যে চরম অবহেলার দায়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ের দুই গেটম্যান মেহেদি হাসান ও হেলাল উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঘটনা তদন্তে বিভাগীয় ও জোনাল দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লার এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তিনি আহতদের সুচিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার জন্য দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার সকাল ৮টার দিকে আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন এসে কাজ শুরু করে এবং বেলা ১১টার পর ওই রুটে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। তিনি ঘোষণা দেন, নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে রেলওয়ের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে জানান।
- বিষয় :
- কুমিল্লা
- রেল দুর্ঘটনা
