বাসডুবি
পদ্মার সেই কান্না ছড়িয়েছে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়ার গ্রামে
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় প্রাণ গেছে স্বজনের। রাজবাড়ী হাসপাতালে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন দুই তরুণী। ছবি-সংগৃহীত
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৬
একে একে মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল স্বজনকে। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের সামনে তখন কান্নার রোল। আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। দৌলতদিয়া ঘাটে নদীতে বাসডুবির পর ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় এই হাসপাতালে। বুধবার রাত ৩টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৫ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। কেউ অ্যাম্বুলেন্সে, কেউ মাইক্রোবাসে করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছেন মরদেহ।
বুধবার বিকেলে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। সেটিতে অন্তত ৫৫ যাত্রী ছিলেন। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে আছেন ১১ নারী ও সাত শিশু। এ ছাড়া জীবিত উদ্ধার করা হয় ১১ জনকে। তাদের তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাসটি ঘাটে আসার পর বেশ কয়েকজন নেমে গিয়েছিলেন। কেউ নিখোঁজ আছেন কিনা সে ব্যাপারে জানা যায়নি।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নিখোঁজের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। কারও স্বজন নিখোঁজ থাকলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। উদ্ধারকাজে গতকাল সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়। নিখোঁজের কোনো তথ্য না পেলেও আজ সকাল ৮টা থেকে আবার উদ্ধার কাজ শুরু হবে।
নিহতদের মধ্যে ১৮ জনের বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। পাঁচজন কুষ্টিয়ার। অন্যরা ঝিনাইদহ, ঢাকা, গোপালগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর থেকেই স্বজনরা ঘাট এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। তাদের কান্না এখন ছড়িয়েছে গ্রামগুলোতে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও অন্যান্য বিষয়ে নিশ্চিত হতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মহিদুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদনের জন্য তাদের তিন কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। বাসটি বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নদী থেকে তোলার পর ভেতরে ১৪ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ডুবুরি দল এবং স্থানীয় লোকজন আরও ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন।
নদীতে ডুবে যাওয়া বাসটি টেনে তুলেছে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসের একটি অংশ দৃশ্যমান হয়। সাড়ে ১১টা দিকে পুরো বাসটি ক্রেন দিয়ে টেনে পন্টুনে তোলা হয়।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা বাসযাত্রী সাকিব হোসেন, আবদুল আজিজ ও দেলোয়ার হোসেন জানান, বাসের ৪৬টি আসন পূর্ণ ছিল এবং ইঞ্জিন কভারে তিন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া যাত্রীদের কোলে শিশুরা ছিল। পন্টুনে ওঠার আগে বেশ কয়েকজন নেমে গিয়েছিলেন। অধিকাংশ যাত্রী বাসের মধ্যেই ছিলেন। দুর্ঘটনার পর সাত-আট যাত্রী বাস থেকে বেরিয়ে এলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে জানান, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাস ফেরিতে ওঠার আগে সব যাত্রী নামিয়ে দিতে হবে। চালক খালি বাস নিয়ে ফেরিতে উঠবেন। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফেরিঘাটে পন্টুনে আরও মজবুত ও কার্যকর রেলিং স্থাপন করা হবে।
বাসডুবিতে নিহতরা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভা এলাকার মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার, কুষ্টিয়া পৌরসভা এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়িয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস, রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা এলাকার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি, একই এলাকার কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ, গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার, তাঁর মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার আরব খানের ছেলে আরমান খান, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আবদুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর এলাকার সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার, একই এলাকার মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী জোছনা, গোপালগঞ্জ জেলার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা বেগম, ঢাকার আশুলিয়া এলাকার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা, রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান (৭ মাস), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আবদুল আজিজের ছেলে আবদুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদসী ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), রাজবাড়ী শহরের ভবানীপুর এলাকার ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান, রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ, একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল ইসলাম এবং রাজবাড়ী সদর উপজেরার বোয়ালিয়া গ্রামের মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বিল্লাল হোসেনের ছেলে ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী পৌরসভার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭)।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আল আহসান, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ, রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তারসহ কর্মর্তারা গতকাল দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। সুলতানা আক্তার বলেন, অতিরিক্ত গতির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত যাত্রীদের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও আহত যাত্রীদের ১৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আল আহসান বলেন, ‘সহায়তা দিয়েতো মানুষকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। লাশগুলো দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা করে এবং আহতদের প্রতিজনকে চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। যারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের পরিবারকে স্থায়ী পুনর্বাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একজনও নিখোঁজ থাকবে, ততক্ষণ
উদ্ধার অভিযান চলবে।’
রাত থেকে মরদেহ হস্তান্তর
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এস এম এ হান্নান জানান, রাত ২টার পর থেকে মরদেহগুলো হাসপাতালে আসতে শুরু করে। হাসপাতালের বারান্দায় সেগুলো রাখা হয়। রাত ৩টায় শুরু হয় মরদেহ হস্তান্তর, তা চলে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত। হস্তান্তরকালে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজবাড়ীতে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত
বাসডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় রাজবাড়ীতে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করা হয়। সকালে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। স্টেডিয়ামে শুধু কুচকাওয়াজ হয়েছে। খুবই সাধারণভাবে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাসহ আনন্দ আয়োজন বন্ধ রাখা হয়।
জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়া ২৫ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্য একজনের বাড়ি দিনাজপুরে। ওই মরদেহ হিমঘরে রাখা আছে। স্বজনরা এলে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ আছেন বলে জানা নেই। জেলা প্রশাসনের ভেরিফায়েড ফেসবুকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কারও স্বজন নিখোঁজ থাকলে যেন যোগাযোগ করে।
তদন্ত কমিটি
গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসে কতজন যাত্রী ছিলেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও অন্যান্য বিষয়ে নিশ্চিত হতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মহিদুল ইসলামকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি।
