‘আমিও মরি না, পাগল ছেড়াডাও মরে না’
২৫ বছর ধরে শিকলবন্দি মানসিক ভারসাম্যহীন হারুন-অর-রশিদ সমকাল
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় রেজিয়া খাতুনকে তালাক দেন স্বামী। বাবার বাড়িতে দরিদ্র ভাইয়ের কাছে চলে আসার পর ছেলে হারুনের জন্ম। খেয়ে না খেয়ে লেখাপড়া শিখে বিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন হারুন। কিন্তু ফরম পূরণের পরপরই মানসিক রোগে আক্রান্ত হন তিনি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারায় শিকলবন্দি জীবন কাটছে তাঁর। প্রায় ২৫ বছর ধরে হারুনকে সেবাশুশ্রূষা করে
ক্লান্ত রেজিয়া। রেজিয়া খাতুনের বাড়ি নান্দাইল উপজেলার রাজগাতী ইউনিয়নের পূর্ব দরিল্লা গ্রামে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বানাইল গ্রামের নূর হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রেজিয়া খাতুনের (৭২)। তবে বিয়ের সঠিক দিন-তারিখ মনে নেই তাঁর। বিয়ের কয়েক বছর পর সন্তান না হওয়ার ক্ষোভে রেজিয়াকে নির্যাতন করতেন স্বামী। একপর্যায়ে স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলেও রাগের মাথায় তালাক দেন। এরপর থেকেই বাবার বাড়িতে একমাত্র ভাই আসলামের সংসারে বসবাস করছেন রেজিয়া। ভাইয়ের সংসারে আসার পর ছেলে সন্তানের মা হন তিনি। তাঁর নাম রাখেন হারুন-অর রশিদ (৪২)। মামার বাড়িতে থেকে অভাব-অনটনের মধ্যেই লেখাপড়া করতে থাকেন হারুন। একসময় কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ২০০০ সালে নান্দাইল শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজ (বর্তমানে সরকারি) থেকে বিএ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেন। কিন্তু এরপরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়
হারুনের। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি মা রেজিয়া।
ছোট্ট বাড়িতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় প্রতিবেশী সিরাজ উদ্দিনের একটি ঘরের বারান্দায় পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে হারুনকে। মা রেজিয়া খাতুন প্রতিদিন থালায় করে ভাত নিয়ে হারুনকে খাইয়ে দেন। এতদিন কিছু না করলেও এখন ভাত নিয়ে গেলে হারুন প্রায়ই তাঁর মাকে মারধর করাসহ কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলছেন।
গতকাল শুক্রবার পূর্ব দরিল্লা গ্রামে হারুনের মামা আসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সিরাজ উদ্দিনের বাড়ির সামনে আধাভাঙা একটি ঘরের নোংরা বারান্দায় শিকলে বাঁধা হারুন দাঁড়িয়ে আছেন। মাথা এবং মুখে আধাপাকা চুল-দাড়ি। পরনে ছেঁড়া নোংরা একটি জিন্সের প্যান্ট, গায়ে ছেঁড়া ও নোংরা একটি নীল রঙের কম্বল। এ প্রতিবেদককে দেখেই অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেন।
প্রতিবেশী কাছুম আলী জানান, মাঝেমধ্যে সে এমন কথা বলে, যা শুনে কেউ বলবে না হারুনের মাথায় সমস্যা আছে। জানতে চাইলে হারুন বিএ পড়াকালীন তাঁর কলেজের নাম, দুজন শিক্ষকের নাম, তারা কে কোন বিষয় পড়াতেন গড়গড় করে সব বলে দেন।
মা রেজিয়া বলেন, ‘আমার স্বামী, বাড়ি, জমাজমি কিছুই নাই। ভাইও মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়, একটি ঘরও ভাঙাচোরা। হারুনকে রাখার মতো জায়গা না থাকায় অন্যের ঘরের বারান্দায় রাখি।’ তিনি জানান, হারুনের নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড আছে, তাঁর নামে আছে একটি বয়স্ক ভাতা কার্ড। তাঁর বয়স হয়েছে, ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। হারুনকে নিয়ে আর কষ্ট সহ্য হচ্ছে না, তিনি মারা গেলে হারুনকে কে দেখবে। এই ক্ষোভ থেকেই তিনি বলেন, ‘আমিও মরি না, পাগল ছেড়াডাও মরে না।’
হারুনের মামা আসলাম জানান, তিনি যেমন পারেন বোন এবং ভাগনেকে দেখাশোনা করেন। শিকলে বাঁধা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাড়া থাকলেই এখানে-সেখানে চলে যায়, খুঁজে আনতে কষ্ট হয়। তবে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারলে হারুন ভালো হবে বলে ধারণা তাঁর, কিন্তু চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তাদের।
নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শামীমা সুলতানার ভাষ্য, বিস্তারিত শুনে মনে হচ্ছে যথাযথ চিকিৎসা পেলে হারুনও সুস্থ হবে। এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ নয়, ঢাকায় মানসিক চিকিৎসা হাসপাতালে নিতে হবে।
- বিষয় :
- মানসিক স্বাস্থ্য
