মৌয়ালের মনে বনদস্যুর ভয়
সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৪ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে যাওয়া বনজীবীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে মধু ও মোম সংগ্রহের পরিমাণও কয়েক বছর ধরে কমছে। বনজীবীদের সুন্দরবনে যাওয়া কমার পেছনে বনদস্যুদের সাম্প্রতিক তৎপরতা একটি বড় কারণ। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের আগেই মাছ-কাঁকড়া শিকারের পাস নিয়ে যাওয়া অসাধু জেলেদের গোপনে মধু সংগ্রহও দায়ী। মৌয়ালদের অভিযোগ, অদক্ষ হাতে চাক নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে বলে মধুর পরিমাণ কমছে।
প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণে ভরপুর সুন্দরবনের মধু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খনিজে সমৃদ্ধ। যে কারণে এই মধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বনের মৌচাক থেকে সরাসরি সংগৃহীত মধুতে কৃত্রিম উপাদান বা চিনি মেশানোর সুযোগ নেই। ফলে এই মধু চাষের মধুর চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।
প্রতিবছরের এপ্রিলের শুরু থেকে পরবর্তী দুই মাসের (৬০ দিন) জন্য মৌয়ালরা বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে সুন্দরবনে যান মধু সংগ্রহের জন্য। গতকাল বুধবার সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুন্দরবনের মধু আহরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। তিনি মৌয়ালদের হাতে পাস তুলে দেন।
বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে অব্যাহতভাবে মধু আহরণে যাওয়া পাস সংগ্রহের সংখ্যা কমেছে। ফলে মধু ও মোম আহরণও কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাস দেওয়া হয় ৬০৪টি। মধু কাটতে সুন্দরবনে যান ৪ হাজার ২৭৭ মৌয়াল। ওই বছর মধু সংগ্রহ হয়েছিল ২১৫৯ দশমিক ১৫ কুইন্টাল। মোম সংগৃহীত হয় ৬৪৭ দশমিক ৮৫ কুইন্টাল।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১১টি পাস নিয়ে বনে যান দুই হাজার ৮৯৮ জন মৌয়াল। সেবার ১৪৪৯ কুইন্টাল মধু ও ৩৩৪ দশমিক ৭০ কুইন্টাল মোম আহরণ করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৬৫টি পাসের অনুকূলে ২৪৫০ মৌয়াল বনে যান। সেবার ১২২৫ কুইন্টাল মধু ও ৩৬৭ দশমিক ৫ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাসের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩৬৪টিতে। ২৪৭১ মৌয়াল ওই বছর বনে যান। তারা ১২৩৫ দশমিক ৫০ কুইন্টাল মধু ও ৩৭০ দশমিক ৬৫ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪৮টি পাসের বিপরীতে বনে যান মাত্র ১৭০৯ জন মৌয়াল। এবার মধু সংগ্রহ কমে দাঁড়ায় ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টালে। মোম সংগৃহীত হয় মাত্র ২৫৭ দশমিক ৫ কুইন্টাল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মৌয়ালের সংখ্যা ও মধু আহরণ কেন কমছে, এ বিষয়ে বন বিভাগ ও মৌয়ালদের সঙ্গে কথা হয় সমকালের। তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশিক্ষিত মৌয়ালের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়াও জলদস্যুদের অপতৎপরতা, বনজীবীদের পেশা পরিবর্তন, বিরূপ আবহাওয়া ও চোরাই মধু সংগ্রহ করাকে এজন্য দায়ী করেন তারা।
প্রধান আতঙ্ক বনদস্যু
দুই দশক ধরে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ করে আসছেন শ্যামনগরের শ্রীলফলকাঠি গ্রামের শরীফ উদ্দীন। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবন দস্যুদের নিরাপদ আস্তানা হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে অগ্রিম চুক্তি না করে বনে ঢুকলে মৌয়ালদের জিম্মি করে মোটা টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। দস্যুদের দাবি করা টাকা, মধুর পাস সংগ্রহ ছাড়াও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে চালান উঠানোই কঠিন হয়ে যায়। এ কারণে প্রকৃত মৌয়ালের মধ্যে বনে যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।
হরিনগর গ্রামের মৌয়াল আকবর আলীর ভাষ্য, চলতি বছরে তিনি দুটি নৌকায় করে ১৫ জন মৌয়ালকে বনে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। এজন্য পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে তৎপর দয়াল, নানাভাই ও জোনাব বাহিনীর সদস্যরা প্রতি মৌয়ালের জন্য প্রতি ১৫ দিনের জন্য ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছে। তিনি বলেন, দরদাম করে দস্যুদের দাবি করা টাকার অংক যদি কমাতে না পারেন, তাহলে মধু সংগ্রহে নৌকা পাঠাবেন না।
চোরাই মধু সংগ্রাহকের উৎপাত
সুন্দরবনের মধু কেনাবেচার ব্যবসা করেন মাজাট গ্রামের মো. হাফিজুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, পাঁচ-ছয় বছরে সুন্দরবনে চোরাইভাবে মধু সংগ্রহকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মূলত এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক অনুমতি পাওয়া যায়। তবে মাছ ও কাঁকড়া শিকারে সুন্দরবনে অবস্থানকারী বনজীবীরা এর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই চাক কেটে মধু সংগ্রহ করেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি বেশি দামে তাদের কাছ থেকে মধু কিনেছেন।
হরিনগরের আকবর হোসেন ও গাবুরার আব্দুল হাকিমসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সময়ের আগে যেসব বনজীবীরা সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ করতে যান, তারা অদক্ষ হওয়ায় মৌমাছির চাক নষ্ট করে ফেলেন। ফলে নির্ধারিত সময়ে বনে গিয়ে প্রকৃত মৌয়ালরা প্রত্যাশামতো মধু পান না। এ কারণে তারা বনে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বৃষ্টিপাত না হওয়ার প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনে প্রত্যাশামতো মধু মিলছে না। মৌয়াল ও সুন্দরবনের প্রকৃতি, জীব ও প্রাণ-বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা একাধিক ব্যক্তি এমন তথ্য দিয়েছেন। মৌয়াল হাফিজুর রহমান, উন্নয়ন সংগঠক গাজী আল ইমরানের ভাষ্য, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় প্রায় এক দশক ধরে মৌসুমে সুন্দরবন থেকে প্রত্যাশামতো মধু মিলছে না। সাধারণত মধু মৌসুমের আগে কম-বেশি বৃষ্টি হলে খলিশা, কেওড়া, বাইন, গেওয়া, সুন্দরী, কাঁকড়া, গরান, হরকচাসহ অন্যান্য গাছে দ্রুত ফুল আসে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। যে কারণে এসব গাছে ফুল আসতে কিছু দেরি হচ্ছে। ফলে এপ্রিলের শুরুতে বনে গিয়ে মৌয়ালরা প্রত্যাশামতো মধু পান না। হতাশায় অনেকে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
এসব নিশ্চিত করেন বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে পেশা পরিবর্তন করে চলেছেন। এ কারণে প্রশিক্ষিত মৌয়ালের সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন বনজীবীরা সুন্দরবনের মৌচাক কাটার কৌশল জানেন না। ফলে তারা পুরো চাক নষ্ট করে ফেলছেন। এসব কারণে আগের মতো মধু মিলছে না।
সিডিও ইয়ুথের নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরানের ভাষ্য, সুন্দরবন থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই মধু আহরণে জড়িতদের তালিকা করে তাদের বনে প্রবেশ ঠেকাতে হবে। এ ছাড়া দস্যুদের অপতৎপরতা বন্ধ, পেশাদার মৌয়ালের অনুকূলে পাস ইস্যু করলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা বনে যেতে আগ্রহী হবেন। এটি করা গেলেই সুন্দরবন থেকে পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ সম্ভব।
শ্যামনগর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব ইয়াছিন আকরাম বলেন, সুন্দরবন লাগোয়া এলাকার প্রায় অর্ধশত লোক বনের মধুর সঙ্গে জ্বালানো চিনি মিশিয়ে বিক্রি করেন। পুলিশ ও কোস্টগার্ডের অভিযানে ভেজাল মধুসহ একাধিকবার তারা আটক হয়। তবে জামিনে ছাড়া পেয়েও একই কাজে জড়িয়েছেন। জিআই সনদ লাভের পর সুন্দরবনের মধুর বিষয়ে ক্রেতার আগ্রহ বেড়েছে। এর বিপরীতে সুন্দরবন থেকে পর্যায়ক্রমে মধু আহরণ কমছে। এই সুযোগ নিয়েছে ভেজাল মধু কারবারিরা। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই।
ভেজাল মধু তৈরিতে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর সচেতনতা চান বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জার ও বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত ও পেশাদার মৌয়াল ছাড়া মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ যথাযথ হয় না। এ ছাড়া বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সময়মতো প্রত্যাশামতো মধু মিলছে না। এই সুযোগ নিচ্ছে দুষ্ট চক্র। তাদের ভেজাল মধু সুন্দরবনের মধুর সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। তাদের ঠেকাতে এলাকাবাসীর সহায়তা প্রয়োজন।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার আত্মহত্যার সমান
বিষ দিয়ে সুন্দরবনের মাছ শিকারকে আত্মহত্যার সমতূল্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। গতকাল বুধবার সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুন্দরবনের মধু আহরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন কথা বলেন তিনি।
বন বিভাগের আয়োজনে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত হয় অনুষ্ঠানটি। সেখানে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ফলে আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ছাড়া সুন্দরবনের জীব ও প্রাণ-বৈচিত্র্য এমনকি বন্যপ্রাণী–সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই বিষের জন্য।
প্রতিটি মাছের আড়তে পরীক্ষা চালিয়ে বিষ প্রয়োগে শিকার করা মাছ শনাক্তের পর ওই মাছ সরবরাহকারীর মাধ্যমে মূল শিকারি পর্যন্ত পৌঁছানো হবে বলেও সতর্ক করে দেন শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। তিনি একইভাবে সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতায় জড়িতদের আটকে চেষ্টা চালানোর ঘোষণা দেন।
উপকূলবাসীর সুপেয় পানি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গোলপাতা সংগ্রহের অনুমতিও দেওয়া হবে। সুন্দরবনে তৎপর জলদস্যুরা যাদের সহায়তায় অপকর্ম করবে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
সুন্দরবন ঘিরে পর্যটনশিল্পের বিকাশসংক্রান্ত এলাকাবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানান শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পর্যটননগরী গড়ে তোলার আগে স্থানীয় লোকজনের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। জলদস্যু তৎপরতা বন্ধসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে এই এলাকার প্রতি পর্যটকের আস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের বিকাশ সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী লায়ন শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত মৌয়ালদের হাতে পাস বা অনুমতিপত্র তুলে দেন। এ ছাড়া সুন্দরবনে তৎপর জলদস্যুদের বিরুদ্ধে তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে উপস্থিত র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে নির্দেশনা দেন।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের সভাপতিত্বে মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার, পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, র্যাব সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাসানুর রহমান প্রমুখ।
