রামেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু অর্ধশত, বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য নেই
ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:০৬ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:১০
হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে আরও চার শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে শুধু রামেক হাসপাতালে মারা গেল ৫০ শিশু। যা চিকিৎসাধীন শিশুর শতকরা হার প্রায় ১০ শতাংশ। তবে বেসরকারি বিভিন্ন ক্লিনিক মিলিয়ে মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও বেশি। তবে এসব তথ্য নেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
রামেক সূত্র জানায়, হামের লক্ষণ নিয়ে রাজশাহী ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ছাড়াও খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার রোগী আসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু এই হাসপাতালটির তিনটি শিশু ওয়ার্ডে সব মিলিয়ে বেড আছে মাত্র ২০০টি। এর বিপরীতে প্রতিদিন রোগী থাকছে ১ হাজার থেকে ১২শ পর্যন্ত। সম্প্রতি আইসিইউ বেড ১২টি থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৮টি। এরমধ্যে শুধু হামের জন্য বরাদ্দ ১২টি। অন্যান্য রোগীর জন্য ৬টি বেড রাখা হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়ে হয় ডাক্তার, নার্স ও আয়া-কর্মচারীদের। তবে এর মাঝেই হাসপাতালের বেড, বারান্দা, মেঝেসহ সর্বত্র রোগী রেখে দেওয়া হয় চিকিৎসা।
রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, গত জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে আক্রান্ত ৪৭৯ শিশু। এরমধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫০ শিশু। আর, হাম পজেটিভে এক শিশু মারা গেছে।
আইসিইউ’র অভাবে মরছে সব বয়সী মানুষ
রোগীর চাপে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শয্যা না পেয়ে অপেক্ষমাণ অবস্থায় গত এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ জনই শিশু। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০০ শয্যার নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে আইসিইউ শয্যা রয়েছে মোট ৪০টি। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২, বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ১৬ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২টি শয্যা নির্ধারিত। তবে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অন্য ইউনিট থেকে সমন্বয় করে শিশু আইসিইউতে আরও ৬টি বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত মার্চ মাসে শিশু আইসিইউতে ভর্তি ছিল ১১৯ শিশু এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ জন। অপেক্ষমাণদের মধ্যে ৯১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ষাঠোর্ধো বয়োজ্যেষ্ঠ রোগীদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ ছিলেন ৩০২ জন, এদের মধ্যে ৭০ জন মারা গেছেন আইসিইউ না পেয়ে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন ৩১২ জন। এদের মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মারা যাবার পর আইসিইউ বেড পাচ্ছে অনেক শিশু
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশু মারা যায়। এরা হলো- কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের সুইট রানার ছেলে ছয় মাসের শিশু সামিউল, কুষ্টিয়া সদরের সাধন শেখের ৯ মাসের পুত্র সাইফান (৯ মাস), চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাফিউল্লাহর এক মাসের মেয়ে তাসফিয়া ও পাবনার বেড়ার ইয়াকুব আলীর দুই মাসের কন্যা নেহা।
নেহার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা তার লাশ নিয়ে যখন পাবনায় গ্রামের বাড়ি ফিরছিলেন- সেসময় হাসপাতালের আইসিইউ থেকে ফোন করে তার মাকে জানানো হয়- পিআইসিইউ ফাঁকা হয়েছে। সিরিয়াল অনুযায়ী এখন নেহা বেড পাবে। এই ফোন পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিশুটির মা চামেলী খাতুন।
নেহার খালা মতিয়া খাতুন বলেন, হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে আমার বোনের আহাজারি আর থামছে না। কয়েকদিন ধরে আইসিইউ’র অপেক্ষায় থেকে না পেয়ে নেহা মারা যায়। তাই, আফসোসটা বেড়ে গেছে। জন্মের পর থেকেই ঠান্ডাজনিত অসুখে ভুগছিল নেহা। গত ঈদের দিন তার শরীরে হাম দেখা দেয়। গত ২৩ মার্চ তাকে রামেক হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
গত মঙ্গলবার নেহার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাকে পিআইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরিবার সিরিয়াল দিলে নেহার সিরিয়াল আসে ১২ নম্বর। পিআইসিইউর জন্য অপেক্ষাধীন থাকা অবস্থায় বুধবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর তথ্য নেই বেসরকারি হাসপাতালের
গত ৭ এপ্রিল রাজশাহীর রয়াল হাসপাতালে দুই শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। এমনই রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিডিএম হাসপাতাল সহ বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর খবর গণমাধ্যম আসছে। তবে এসব পরিসংখ্যান রাখছে না সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. রাজিউল করিম বলেন, এখন পর্যন্ত রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় হামের উপসর্গে কোনো মৃত্যুর খবর নেই। শহরের ক্লিনিকে যেসব মৃত্যু হয়- তার হিসাব সিটি করপোরেশন রাখছে। জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে কোনো রোগী হামের উপসর্গে মারা যায়নি। আমাদের কাছে সব তথ্য আছে।’
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের হাসপাতালের তথ্যটাই রাখি।’ তিনি বলেন, বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা পায়নি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি তারাই বেশি মারা যাচ্ছে। এর প্রতিকার পেতে হলে টিকা নিতে হবে। শিশুকে মায়ের বুকের দুধপানসহ ৬ মাস হলে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
- বিষয় :
- রামেক
