ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

একজন বৃদ্ধের জীবনসংগ্রাম

একজন বৃদ্ধের জীবনসংগ্রাম
×

হাঁটবাজারে ছোট্ট দোকান পেতে এভাবেই ছাতা মেরামত করেন বৃদ্ধ শাহ আলম। গত বুধবার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি বাজারেসমকাল

বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃদ্ধ শাহ আলম। বয়স ৭০ বছর। এই বয়সে অনেকেই যখন বিশ্রাম খোঁজেন, তখনও জীবিকার তাগিদে হাটে হাটে ঘুরে বেড়াতে হয় তাঁকে। মাথার ওপর তপ্ত রোদ, কখনও বৃষ্টি– সবকিছু উপেক্ষা করে বিভিন্ন হাট-বাজারে ছোট্ট একটি দোকান সাজিয়ে বসেন তিনি। সেখানে ছাতা মেরামত, পুরোনো তালাচাবি, গ্যাসলাইট ও মাছ ধরার টেঁটা বিক্রি করেই চলছে তাঁর জীবন। তাঁর বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার উত্তর বলরামপুর গ্রামে।

বৃদ্ধ শাহ আলম বলেন, ‘বয়স হইছে, শরীর আগের মতো নাই, তাও কাজ না করলে পেট চলবে না। ছেলেটা নাই, তার বউ ও তিন নাতিন লইয়া চলতে হয়। ৬ জনের সংসার। ৭০ বছর পার করলেও এখনও আমার ভাগ্যে জোটেনি কোনো সরকারি ভাতা। যদি একটা ভাতা পাইতাম, তাহলে বাঁচতে সুবিধা হইত।’
শাহ আলমের জীবনসংগ্রাম শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গল্প নয়, এটি সমাজের বাস্তব চিত্র। যেখানে একজন বৃদ্ধ মানুষ পরিবারকে বাঁচাতে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিচ্ছেন, সেখানে তাঁর জন্য সামান্য সহায়তাও নিশ্চিত হয়নি এই সমাজে। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই কেটে গেছে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। বয়সের কারণে শরীর আগের মতো শক্তি নেই, তবুও পরিবারের কথা ভেবে প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন শাহ আলম। দিন শেষে হাতে আসে সামান্য কিছু টাকা– তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসার।

গত বুধবার বাতাকান্দি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট জায়গায় বসে ছাতা মেরামত করছেন শাহ আলম। তাঁর কাছে কেউ তালা ঠিক করাতে আসেন, কেউ ভাঙা ছাতা, আবার কেউ গ্যাসলাইট মেরামত করাতে, মাছ ধরার টেঁটা কিনতে আসেন। চোখে-মুখে বয়সের ছাপ, হাতে অভিজ্ঞতার ছোঁয়া– প্রতিটি সেলাই ও কাজ যেন জীবনের গল্প বলে। চার সন্তানের বাবা এখন প্রায় নিঃস্ব।
জীবনের এক বেদনাদায়ক স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে শাহ আলমের। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে বড় ছেলে খায়রুলকে ধারদেনা করে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে। স্বপ্ন ছিল– ছেলের রোজগারে একদিন ঘুরে দাঁড়াবে পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। প্রবাসে গিয়ে কিডনি রোগে আক্রান্ত হন খায়রুল। পরে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে চিকিৎসা করাতে গিয়ে শাহ আলমকে বিক্রি করে দিতে হয় তাঁর সব জমিজমা ও শেষ সম্বল বসতভিটা। তবুও শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
খায়রুল মৃত্যুর সময় রেখে যান তিন মেয়ে। এরপর থেকেই তিন নাতনি ও ছেলেবউসহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে বৃদ্ধ শাহ আলমের কাঁধে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েই এখন তিনি হয়ে উঠেছেন পরিবারের অবলম্বন।

অন্য ছেলে বেকার। অনেক কষ্ট করে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখন অন্যের বাড়িতে থাকেন। নিজের বলতে আর কিছু নেই। শাহ আলমের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতি রোববার মাছিমপুর বাজার, সোমবার ঘারমোড়া বাজার, বুধবার বাতাকান্দি বাজার এবং বৃহস্পতিবার শ্রীপুর বাজারে বসে কাজ করেন তিনি। হাতে থাকে কিছু পুরোনো যন্ত্রপাতি।
বলরামপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, শাহ আলম খুবই ভালো মানুষ। নিজের কষ্টের মাঝেও অন্যকে সাহায্য করেন। তাঁর জন্য সরকারি সহায়তা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয়– এখনও কোনো ভাতা বা সহায়তা পাননি, অথচ ধনীরা পাচ্ছেন ভাতা।
বলরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক লোকমান হোসেন জানান, এমন হয়ে থাকলে দুঃখজনক। শাহ আলম যদি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে তিনি তাঁকে ভাতা পাওয়ার জন্য সহযোগিতা করবেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রহিস উদ্দিনের ভাষ্য, তাদের কাছে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভাতার জন্য তালিকা পাঠানো হয়। অনেক সময় ভাতাপ্রাপ্য অনেকে বাদ পড়ে যান এটা ঠিক। খবর নিয়ে তাঁর ভাতার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×