পদ্মায় চলাচলে ‘অলিখিত টোল’ চাঁদা দিয়ে বালু ব্যবসা
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদী ও চরাঞ্চল ঘিরে চরমপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চরমপন্থি নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করেই বালু উত্তোলন করতে হচ্ছে ইজারাদারদের। পাশাপাশি নদীপথে নৌযান চলাচল করতেও তাদের কাছ থেকে অলিখিত অনুমতি নিতে হচ্ছে। প্রায় দুই বছর ধরে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের এলাকায় নদীকেন্দ্রিক এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সশস্ত্র গ্রুপগুলো।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হলেও চরমপন্থিদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। বরং অভিযানের পরও বালুমহাল ঘিরে একাধিক গুলিবর্ষণ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। রাতের আঁধারে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। গত দুই বছরে অন্তত ১০ থেকে ১২টি গুলির ঘটনা ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে ইজারাদার ও নৌযান মালিকরা চরমপন্থিদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করছেন। মাস শেষে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি ভেড়ামারায় কাকন বাহিনীর
সদস্যদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। টোল আদায়কে কেন্দ্র করে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভেড়ামারা ও কুমারখালী থানায়
একাধিক মামলা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে চারজন নিহত ও ১৫ থেকে ২০ জন আহতের ঘটনাও ঘটেছে।
ইটনা, ভেড়ামারা, কুমারখালীসহ বিভিন্ন এলাকার বালুমহাল ঘুরে ইজারাদার ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। পরে সমঝোতা না হলে সরাসরি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইজারাদার বলেন, ‘রাতে অস্ত্রধারীরা এসে গুলি করে, লোকজনকে জিম্মি করে টাকা নিয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। প্রতিদিন আয়ের একটি অংশ দিতে হয়।’
নদীপথে চলাচলকারী মাঝিরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি নৌকা থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা ‘নিরাপত্তা টোল’ নেওয়া হয়। বর্ষা মৌসুমে এ সংখ্যা বাড়ে। এই অর্থ না দিলে নৌযান চলাচলে বাধা ও হামলার শিকার হতে হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নাটোর থেকে পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত কাকন বাহিনীর প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়া, পাবনা থেকে রাজবাড়ী পর্যন্ত এলাকায় জাসদ গণবাহিনী (কালু গ্রুপ) সক্রিয়। এসব গ্রুপের সদস্যরা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এবং নদীপথ নিয়ন্ত্রণে স্পিডবোট ব্যবহার করছে। এ দুই দলে শতাধিক সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীপথে টহল থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। তবে এক শীর্ষ চরমপন্থি নেতা হোয়াটসঅ্যাপে দাবি করেন, ‘আমরা নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন করি না। চাঁদা নিই না, তবে সংগঠন চালাতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়।’
সম্প্রতি তিন জেলার পুলিশের যৌথ অভিযানে কিছু অস্ত্র ও একটি স্পিডবোট উদ্ধার এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। দুটি ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়েছিল। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার গুলিবর্ষণ ও মহড়া শুরু হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীন বলেন, ‘চরমপন্থিদের বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। বালুমহালকেন্দ্রিক হামলা ও গুলির ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান। তিনি বলেন, সব বালু মহাল সরকারিভাবে ইজারার ব্যবস্থা করা হবে। রাজস্ব খাতের আওতায় আনলেই নিয়ম বন্ধ হবে। কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, নদীপথে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন। তারা চাইলে সব ধরনের সহযোগিতা করব।
- বিষয় :
- পদ্মা
