তিন বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ
পশুর নদ থেকে তোলা নোনাবালু ফেলা হচ্ছে কৃষিজমিতে। সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের কলাতলা গ্রামে সমকাল
মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
পশুর নদ ড্রেজিং প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন বছর ধরে সাড়ে চার শতাধিক ব্যক্তির জমিতে নোনাবালু ফেলছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পাননি কেউই। তারা ক্ষতিপূরণ পাবেন কিনা– এ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছেন ভুক্তভোগীরা।
মোংলা বন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পশুর নদের ড্রেজিং করা নোনা বালু ফেলার জন্য উপজেলার চিলা ইউনিয়নের ৭০০ একর জমি হুকুম দখল করা হয়। প্রথম দফায় ২০২১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জমি ভরাট করা হয়। ২০২৩ সালে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে একই বছরের জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় ওই ইউনিয়নের প্রায় ৩২৩ একর জমিতে পুনরায় নোনা বালু ফেলা শুরু হয়। এখনও এই প্রক্রিয়া চলছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, দ্বিতীয় দফায় নোনা বালু ফেলায় সাড়ে চার শতাধিক জমির মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের কেউ হারিয়েছেন কৃষিজমি, কেউ চিংড়িঘের। অনেকের বসতভিটা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কৃষিজমি ও ঘেরই ছিল তাদের জীবিকার উৎস। বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা বলেন, জমিতে বালু ফেলার শুরুতে সরকারিভাবে হুকুম দখলের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত হুকুম দখল বাবদ কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। শুরুতে তাদের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
ওই এলাকার সাড়ে চার একর জমি ছিল হুমায়ুন কবিরের। তিন বছর ধরে দফায় দফায় তাঁর জমিতে নোনা বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদার রেখে যাওয়া কৃষিজমি ও বসতভিটা ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব জমিতে আগে ধান ও মাছ চাষ করে সংসার চালাতাম।’
মনু মিয়া স্কুল-সংলগ্ন কলাতলা গ্রামের জালাল হাওলাদার হারিয়েছেন ১২ একর জমি। একই এলাকার আলম গাজীর তিন একর জমি এভাবে ভরাট করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জমিতে বালু ফেলার শুরু হওয়ার সময় সরকারিভাবে হুকুম দখলের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। কৃষিজমি, মাছের ঘের ও বাড়িঘর ভিটেমাটি হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিপূরণ পেলে অন্তত নতুনভাবে জীবন শুরুর সুযোগ পেতেন।
চিলাবাজার এলাকার বাসিন্দা লুৎফর রহমান হারিয়েছেন তাঁর এক একর জমি। তিনি বলেন, ‘আমাদের জমির কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়েছে। তালিকাও করা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু কবে, কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে–সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।’
গৃহবধূ সোনিয়া আক্তারের পরিবার দেড় একর, খুরশিদা বেগমের পরিবার দুই একর ও মুরতি হালদারের পরিবারের চার একর জমি এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বালু ফেলার আগে জমিতে কৃষিকাজ ও মাছ চাষ হতো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আয় করতেন। এখন বালু ফেলায় যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, এতে ২০-২৫ বছরেও এসব জমিতে কিছু জন্মাবে না। উল্টো ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধে নানা টালবাহানা হচ্ছে।
এর প্রতিবাদে ৪ এপ্রিল চিলা ইউনিয়নের কলাতলায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। চিলা ইউনিয়ন কৃষিজমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
পশুর নদ ড্রেজিংয়ের প্রকল্প পরিচালক ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল ও হাইড্রোলিক) শেখ শওকত আলী এ বিষয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকদের বকেয়া পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে হুকুম দখলের প্রস্তাব অনুমোদন হয়নি। দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের ভাষ্য, সরকারি কিছু নিয়মকানুনের কারণে হুকুম দখলে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মালিকের বকেয়া পরিশোধ করা যায়নি। পাওনা পরিশোধে জেলা প্রশাসন আন্তরিক। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ক্ষতিপূরণ
