ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরকারি অ্যাপকে ছাড়িয়ে ফুয়েল মডেল জনপ্রিয়

সরকারি অ্যাপকে ছাড়িয়ে  ফুয়েল মডেল জনপ্রিয়
×

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করেছে। তবে সে অ্যাপ ব্যবহারে জটিলতা রয়েছে। এদিকে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তৈরি স্থানীয় ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপটি সহজ ব্যবহার, দ্রুত সেবা ও কার্যকর নজরদারির কারণে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 

রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ ব্যবহারে গ্রাহকদের পূর্ব নিবন্ধন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কিউআর কোড সংগ্রহ বাধ্যতামূলক হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাইভেটকারের ক্ষেত্রে মালিক ও চালকের ভিন্নতা থেকেও জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর উদ্যোগে গত ৯ এপ্রিল থেকে রাজধানীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চালু হয়। তবে অ্যাপ ডাউনলোড ও নিবন্ধন জটিলতায় অনেকেই ফুয়েল পাস নিতে পারছেন না। গত ১২ এপ্রিল তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। পাম্পে আসা ক্রেতারা জানান, ফুয়েল পাস অ্যাপে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, ফলে আগের নিয়মেই তেল নিতে হচ্ছে। কর্মচারীরাও জানান, সার্ভার জটিলতার কারণে আপাতত আগের পদ্ধতিতেই জ্বালানি সরবরাহ চলছে।
অন্যদিকে নওগাঁ জেলা প্রশাসন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে তৈরি স্থানীয় ফুয়েল অ্যাপে গ্রাহকদের কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন হয় না। শুধু ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের অ্যাকাউন্ট থেকে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ব্যবহার সহজ হয়েছে এবং সার্ভারের ওপর চাপও কম থাকে।
এ অ্যাপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—লিটারের পাশাপাশি টাকার পরিমাণ ইনপুট দেওয়ার সুবিধা থাকায় খুচরা টাকার ঝামেলা কমে এবং দ্রুত জ্বালানি বিক্রি সম্ভব হয়। এ ছাড়া শুধু প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়ায় সার্ভারের ওপর চাপ কম থাকে। ফুয়েল পাস অ্যাপে যেখানে দেশের প্রায় ৫৯ লাখ লাইসেন্সধারীর তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়, সেখানে নওগাঁর অ্যাপে সীমিতসংখ্যক (প্রায় ১০ হাজার) ফিলিং স্টেশন কর্মীর অ্যাকাউন্ট ব্যবহৃত হওয়ায় সার্ভার ঝুঁকি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নওগাঁর অ্যাপে জ্বালানি নেওয়ার সময় বাধ্যতামূলকভাবে যানবাহনের মাইলেজ ইনপুট দিতে হয় এবং পরের বার তা হালনাগাদ করতে হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুতের সুযোগ থাকে না। একই সঙ্গে কৃষিযন্ত্র ও জরুরি সেবায় ব্যবহৃত জেনারেটরের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এতে নাম্বার প্লেট স্ক্যানিং (OCR প্রযুক্তি), রিয়েল-টাইম মনিটরিং, ইনপুট-আউটপুট হিসাব এবং এআইভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও অপরাধ প্রতিরোধেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। 

বর্তমানে নওগাঁর ৫৩টি, রাজশাহীর ২৭টি, পাবনার ৩২টি, জয়পুরহাটের ২০টি এবং বগুড়ার ৫টিসহ মোট ১৩৭টি ফিলিং স্টেশনে অ্যাপটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার লিটার জ্বালানি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।
ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেল চালক নিরব আহমেদ বলেন, ‘কোনো নিবন্ধন ছাড়াই সরাসরি তেল নেওয়া যায়—এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।’ গ্রাহক মোজাম্মেল হক জানান, ‘আগের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বারবার তেল নেওয়ার সুযোগ নেই, ফলে সবার জন্য জ্বালানি নিশ্চিত হচ্ছে।’
নওগাঁ শহরের শাকিব ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রুহুল আমিন বলেন, ‘আগে কাগজে হিসাব রাখতে হতো, এখন সবকিছু অ্যাপে হচ্ছে—সময় ও ঝামেলা দুটোই কমেছে।’ মজুমদার ফিলিং স্টেশনের মালিক ব্রজেন মজুমদার জানান, টাকায় ইনপুট দেওয়ার সুবিধায় খুচরা টাকার সমস্যা কমেছে।

ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপটির ডেভেলপার আইসিটি অধিদপ্তরের প্রোগ্রামার বিপ্লব চন্দ্র সরকার জানান, অ্যাপটি অ্যানড্রয়েড ও আইফোন উভয় প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারযোগ্য। এর মাধ্যমে প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা হিসেবে ফিলিং স্টেশন কর্মীদের কাছে পৌঁছে যায়। তিনি আরও জানান, পেট্রোল, অকটেন, ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানির তথ্য সংরক্ষণ করা যায় এবং জাতীয় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য রোলভিত্তিক ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। এতে সন্দেহজনক রিফুয়েলিংসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মাসুদুল হক বলেন, ‘কম ডেটা ব্যবহার করেই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেছে। মাইলেজভিত্তিক যাচাইয়ের কারণে অপচয় ও মজুত প্রায় অসম্ভব।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় বাস্তবতায় তৈরি এই অ্যাপ স্বল্প ব্যয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। এটি বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অনিয়ম অনেকাংশে কমবে।’
 

আরও পড়ুন

×