ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি
হুমকিতে বসতবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত রৌমারী উপজেলার উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের সেনাপুর এলাকা
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৫৩
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে আবারও দেখা দিয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন। গত দুই সপ্তাহে বিলীন হয়েছে শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি। ভাঙনের মুখে রয়েছে কয়েকশ পরিবার, ফসলি জমি, চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিন দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী ও সুখেরবাতি এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিলীন হয়েছে শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি। ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তীরবর্তী মানুষজন। যে কোনো সময় বসতভিটা নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
চর গেন্দার আলগাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা প্রায় দশ মাস আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ মাস আগে একই ইউনিয়নের সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, চর গেন্দার আলগা, গেন্দার আলগা, সোনাপুর ও নামাজের চর এলাকায় অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়েন ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো। বর্তমানে তারা রাস্তার ধারে, অন্যের জমিতে বা অস্থায়ী ঝুপড়িঘরে বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি অভিযোগ স্থানীয়দের।
চরশৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সমসের আলী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০ পরিবারের তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এদিকে আবার নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।
নদীভাঙনের শিকার সোনাপুর এলাকার বাসিন্দা শুকুর আলী বলেন, ‘আমার এই বয়সে পাঁচবার বাড়ি ভেঙেছে। এখন আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই। মানুষের বাঁশঝাড়ের নিচে কোনোমতে থাকি। আবার ভাঙন শুরু হয়েছে, এখন সেটাও টিকবে কিনা জানি না।’
আরেক ভুক্তভোগী রুপচান আলী বলেন, ‘আমার বাড়ি চারবার নদীতে গেছে। এখন অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে আছি। আবার নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের আর থাকার জায়গা থাকবে না।’
চর গেন্দার আলগা এলাকার সুন্দরী খাতুন বলেন, ‘আমার বসতবাড়ি পাঁচবার ভেঙেছে। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব বুঝতে পারি না। স্বামী অসুস্থ, আয়-রোজগার নেই। এক জায়গায় গেলে সেখান থেকেও সরিয়ে দেয়। খুব কষ্টে আছি।’
একই এলাকার বৃদ্ধ সোরমান আলী বলেন, ‘চারবার বাড়ি ভেঙে গেছে। এখন অন্যের জমিতে কোনোভাবে আছি। এই ঘরটাও ভেঙে গেলে যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকবে না।’
ভুক্তভোগী আফজান বেগম বলেন, ‘আমার বাড়ি তিনবার ভেঙেছে। এখন সড়কের পাশে ঝুপড়ি বেঁধে থাকি। দ্রুত ভাঙনরোধের কাজ চাই।’
নদীবিষয়ক সংগঠক মহিউদ্দিন মহির বলেন, ‘প্রতিবারই আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। দ্রুত স্থায়ী ভাঙনরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি।’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জরুরি কাজের জন্য বর্তমানে কোনো বরাদ্দ নেই।’
