ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এনসিটিবির ব্যাকরণবিদ জয়নাল আবেদীনের মানবেতর জীবন

এনসিটিবির ব্যাকরণবিদ জয়নাল আবেদীনের মানবেতর জীবন
×

নান্দাইলের পুরহরি গ্রামের বাড়িটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় বিক্রি করে দিয়েছেন জয়নাল আবেদীন

মজুমদার প্রবাল, নান্দাইল (ময়মনসিংহ) 

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ ১০ বছর জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের লেখক ও সংস্কারক ছিলেন জয়নাল আবেদীন। কিন্তু অবসরে যাওয়ার তিন বছরের অধিক সময় পার হলেও পাচ্ছেন না অবসর ভাতা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের (তহবিল) টাকা। নিজের কাছেও অর্থকড়ি নেই, বাড়িতে ঘর নেই। সড়কের পাশে একটি টংঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। দুঃখ-দুর্দশায় কাটছে তাঁর স্ত্রী ও চার মেয়ের জীবন।

নান্দাইল উপজেলার পুরহরি গ্রামের মৃত আশরাফ উদ্দিনের ছেলে জয়নাল আবেদীন। ১৯৮৮ সালে টাঙ্গাইলের সা’দত কলেজ থেকে বাংলায় এমএ (সম্মান) পাস করেন। পরের বছরই স্থানীয় ইমাম হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক পদে যোগদান করেন। বাংলা ব্যাকরণে পারদর্শী হওয়ায় তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাই ২০১৪ সালে এনসিটিবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পঠিত সব শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ (দ্বিতীয় পত্র) বইয়ের লেখক ও সংস্কারক হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত অন্য কয়েকজন ব্যাকরণবিদের সঙ্গে এ কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। বর্তমান নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বইটির প্রথম সংস্করণ, রচনা ও সম্পদনায় থাকা ছয়জন ব্যাকরণবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বইটির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় তাদের সবার নাম লেখা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষকের নামের সঙ্গে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়নাল আবেদীনের নামও উল্লেখ রয়েছে। এ কাজের জন্য এনটিআরসির ডাকে তাঁকে প্রায়ই ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেতে হতো। অবশ্য এ কাজের জন্য তিনি আলাদা পারিশ্রমিক পেয়েছেন। বাংলা বিষয়ে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।

দীর্ঘ ৩৩ বছর ৪ মাস শিক্ষকতা করে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান জয়নাল আবেদীন। এরপর যথারীতি তাঁর প্রাপ্য অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তিন বছরের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও টাকা পাননি। কিছু জমি থাকলেও তার আয় দিয়ে খাওয়া-পরাসহ মেয়েদের লেখাপড়া করানো তাঁর পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল পুরহরি গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, জয়নাল আবেদীনের ভিটায় কোনো ঘর নেই। শূন্য ভিটায় পুরাতন ভাঙা কিছু টিন, কাঠ স্তূপ করে নীল রঙের পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা।
স্বজনরা জানান, জরাজীর্ণ ঘরটি কয়েক দিন আগে বিক্রি করে দিয়েছেন। সড়কের পাশে একটি টংঘর তৈরি করে সেখানেই বসবাস করছেন জয়নাল আবেদীন। সেখানে গিয়ে দেখা যায় একটি দরজা এবং জানালাবিহীন ঘরে শুয়ে বই পড়ছেন তিনি। পরিচয় পেয়েই উঠে বসেন ছোটখাট চেহারার নম্র-ভদ্র মানুষটি। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সেখানে সিলিন্ডার গ্যাসের চুলায় নিজেই রান্না করে খান। তিনি জানান, বাড়ির ঘরটি জরাজীর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় বিক্রি করে দিয়েছেন। সরকারি অবসর ভাতা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পাচ্ছেন না; হাতেও টাকা নেই। তাই নতুন করে একটি ঘর তৈরি করতে পারছেন না। মেয়েরা ঢাকায় থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় স্ত্রী মেয়েদের সঙ্গে ঢাকা থাকেন। তাদের থাকা-খাওয়া এবং পড়ার খরচ কীভাবে জোগাড় করছেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘বাড়ি থেকে ধান ও তরিতরকারি বিক্রির কিছু টাকা পাঠাই। তবে সে টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। তাদের মামারা দেখাশোনা না করলে লেখাপড়া হতো না।’ এত কিছুর পরও কারও প্রতি কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই তাঁর।

ইমাম হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামালের ভাষ্য, তিনি এই বিদ্যালয়ে এসে জয়নাল আবেদীনকে পাননি। তবে তাঁর বিষয়ে সবকিছু জানেন। অবসর ও কল্যাণের টাকা দেওয়ার দায়িত্ব 
সরকারের আলাদা একটি ট্রাস্টের। সেখানে তাদের করণীয় নেই।
নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি বাকচান্দা আব্দুস সামাদ একাডেমির প্রধান শিক্ষক সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে জয়নাল আবেদীন স্যার খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। টাকা-পয়সার অভাবে তাঁর মেধাবী সন্তানদের লেখাপড়াও বিঘ্নিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাঁর প্রতি একটু সদয় হওয়া।’
গত ১৬ এপ্রিল এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) আজীজ হায়দার ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, তিনি এখানে নতুন এসেছেন। বিস্তারিত জানার জন্য অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। কিন্তু বেশ কয়েকজনের মোবাইল নম্বরে কল দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহসিনা খাতুনের ভাষ্য, শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা তাদের অফিস থেকে দেওয়া হয় না। বিষয়টি নিয়ে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

×