অনাবাদি চরের তরমুজে কৃষকের দিন বদল
সুন্দরগঞ্জের বাদামের চরে তরমুজ ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক সমকাল
মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচর– যেখানে একসময় ধু-ধু বালির স্তূপ ছাড়া কিছুই ছিল না, সেখানে এখন সবুজের সমারোহ। সেই অনাবাদি চরজমিতে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছে তরমুজ চাষ। আধুনিক পদ্ধতি আর কৃষি বিভাগের সহায়তায় গাইবান্ধার চরাঞ্চলে যেন ছোট্ট এক কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। তিস্তার বুকে গড়ে ওঠা এই সবুজ বিপ্লব এখন শুধু ফসল নয়, বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনও। অনাবাদি চরজমি হয়ে উঠছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
জেলার সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়িসহ সাত উপজেলায় কমবেশি তরমুজ চাষ হলেও সুন্দরগঞ্জের ভাটি কাপাসিয়া ও বাদামের চর এবং ফুলছড়ির এড়েন্ডাবাড়ি ও ফজলুপুর চরে মিলছে বাম্পার ফলন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৬ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে।
চরের উত্তপ্ত বালুচরে সাধারণ ফসল চাষ প্রায় অসম্ভব। তবে কৃষকরা সেখানে ব্যবহার করছেন ‘মালচিং’ নামের বিশেষ পদ্ধতি। পলিথিন বা শুকনো পাতা দিয়ে জমি ঢেকে বালির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং আর্দ্রতা ধরে রাখা হচ্ছে। ডিপ ইরিগেশন পদ্ধতিতে কম পানিতে সেচ দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত ফলন। আশ্বিন মাসে বপন করা বীজ থেকে চৈত্রেই ঘরে উঠছে রসালো তরমুজ। কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শেই এই অভিনব পন্থায় তরমুজ আবাদ করছেন কৃষকরা। অনাবাদি বালুচরে ভালো ফলনে অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হচ্ছেন তারা। এতে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক সময়ের পরিত্যক্ত চর এখন কৃষকের স্বপ্নের মাঠ। সুন্দরগঞ্জের বাদামের চরের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে এসব জমি পড়ে থাকত। এবার পাঁচ বিঘায় তরমুজ চাষ করেছি। ফলন ভালো, বাজারেও দাম ভালো– লাভ হচ্ছে।’ একই এলাকার রহিমা বেগমের কণ্ঠেও আনন্দ, ‘ধান ছাড়া কিছু চিন্তাই করিনি আগে। এখন দেখছি বালুচরেও তরমুজ হয়। ভালো আয় হচ্ছে, সংসারে স্বস্তি ফিরেছে।’
তরমুজে ভালো ফলন হলেও কিছু সমস্যা রয়েই গেছে বলে জানিয়েছেন এই দুই কৃষক। তাদের বলেন, ‘আমরা তরমুজ উৎপাদন করতে পারছি, কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে বাজারে নেওয়া। চর এলাকা থেকে পরিবহন খরচ বেশি, রাস্তা ও নৌযান সুবিধা কম থাকায় অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। এ ছাড়া সংরক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তরমুজ পেকে গেলে দ্রুত বিক্রি করতে হয়, না হলে নষ্ট হয়ে যায়। যদি কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সুবিধা থাকত, তাহলে আরও ভালো দাম পেতাম।’
ফুলছড়ির এড়েন্ডাবাড়ি চরের কৃষক আব্দুল মজিদ মিয়া বলেন, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শে প্রথমবার ৩ বিঘায় চাষ করেছি। এত ভালো ফলন পাবো ভাবিনি। আগামী বছর আরও বাড়াবো।’ একই এলাকার খবির উদ্দিন জানান, ‘দুই বিঘা জমিতে তরমুজ করেছি। খরচ কম, লাভ বেশি– এখন প্রায় সব বিক্রি শেষ।’
কৃষকদের হিসাব বলছে, সব খরচ বাদ দিয়েও প্রতি বিঘা জমিতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে। এতে চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে, বাড়ছে কৃষকের আত্মবিশ্বাস। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কৃষকদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ, সার ও কীটনাশকে ভর্তুকি, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে এই সাফল্য আরও টেকসই হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘চরাঞ্চলের অনাবাদি জমি কাজে লাগাতে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। তরমুজ চাষে তারা সফল হচ্ছেন। আগামীতে এ আবাদ আরও বাড়বে।’
- বিষয় :
- তরমুজ
