ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বপ্ন ভেঙেও থামেনি পোশাক শ্রমিক লিমার জীবনযুদ্ধ

স্বপ্ন ভেঙেও থামেনি পোশাক শ্রমিক লিমার জীবনযুদ্ধ
×

পোশাক শ্রমিক মুসলিমা আক্তার লিমা

আবু সালেহ মুসা, টঙ্গী (গাজীপুর)

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ১৫:৩৫

ভোরের আবছা আলো ফোটার আগেই শুরু হয় ছুটে চলা জীবনের গল্প। শিল্পনগরী টঙ্গীর বাতাসে প্রতিদিনের মতো নতুন দিনের আভাস মিললেও, সেই দিনের শুরুটা সবার জন্য একরকম নয়। কারখানার মেশিন চালু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় আরেক যুদ্ধ—বেঁচে থাকার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেরই এক প্রতিচ্ছবি পোশাক শ্রমিক মুসলিমা আক্তার লিমার জীবন। 

প্রতিদিনের মতো গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর থেকে বের হন ২৮ বছর বয়সী পোশাক শ্রমিক মুসলিমা আক্তার লিমা। ধুলোমাখা পথে দ্রুত পায়ে হাঁটেন তিনি। পথ চলার ছন্দই যেন বুঝিয়ে দেয় সেলাই মেশিনের পেছনে তার কেটেছে অনেক বছর। সূর্য দিগন্তরেখা স্পর্শ করার আগেই শুরু হয়ে যায় লিমার দিন। বিশ্বব্যাপী ফ্যাশনশিল্পের বিপুল চাহিদা মেটাতেই তার এত তাড়া।

পোশাক শ্রমিক মুসলিমা আক্তার লিমা ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর থানার কাজিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। বাবা বাচ্চু মিয়ার তিন মেয়ের মধ্যে লিমা সবার বড়। তিনি কাজ করছেন হংকং ভিত্তিক কারখানা হপলুনে সুয়িং অপারেটর হিসেবে।

মুসলিমা আক্তার লিমা সমকালকে বলেন, তাঁর জীবনে এমন একটা সময় এসেছিল যে- হয়তো তিনি নাও বেঁচে থাকতে পারতেন। একটি ভুলের জন্য আজ তার এমন অবস্থা বলে তিনি মনে করেন। ভালোবেসে বিয়ে করে মাত্র চার মাস সংসার করেন তিনি। পরে স্বামীর বাড়ির অত্যাচারে বাবা-মার কাছে চলে আসেন তিনি। 

তিনি জানান, এরপর শুরু হয় তার সংগ্রামের জীবন। তিনি তার এক আত্মীয়র সঙ্গে টঙ্গীতে চলে আসেন। পরে হোপলুনে কাজ নেন। এর মাঝে তাঁর বাবা মারা যান। ভাই না থাকায় সব দ্বায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। থাকা খাওয়ার খরচ রেখে সব টাকা বাড়িতে মা ও দুইবোনকে পাঠান তিনি। এভাবেই চলেছে তার সংগ্রামের জীবন।

লিমা আরও জানান, তবে এই কষ্টের মধ্যেও তিনি জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন। পোশাক কারখানাটি তাকে এই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তারা তার কাজের পাশাপাশি জীবন মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি শিক্যান ট্রেনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিজের ও কাজের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। লিমার মতো হাজারো নারী এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে সুবিধা পাচ্ছেন।

হপলুন কর্তৃপক্ষ জানায়, কাজের পাশাপাশি শ্রমিকদের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সার্বিক উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর দক্ষতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালে ‘SheCAN’ (শি ক্যান) প্রোগ্রাম চালু করা হয়।

এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যার লক্ষ্য কর্মীদের সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রোগ্রামের আওতায় ২০ হাজারের বেশি কর্মী উপকৃত হচ্ছেন। কারখানাভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ট্যালেনট্র্যাকের লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি পোশাক শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশে কাজ করে আসছে।

এ বিষয়ে ট্যালেন ট্র্যাকের লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্যালেন ট্র্যাকের লিমিটেড দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবসময় বাস্তবভিত্তিক ও প্রভাবশালী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। হপ লুন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সঙ্গে এই শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা উন্নয়নে একটি সুসংগঠিত ও ফলপ্রসূ মডেল বাস্তবায়ন করছি।

এমন উদ্যোগের বিষয়ে হপলুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে কর্মীদের জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

আরও পড়ুন

×