ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য জমিতে ধান কাটতে পারছেন না কৃষক

কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য জমিতে ধান কাটতে পারছেন না কৃষক
×

ঘাটাইল উপজেলার লক্ষিন্দর গ্রামে কারখানার বর্জ্য বৃষ্টিতে ছড়িয়ে পড়েছে ধানক্ষেতে সমকাল

ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

জৈব সার কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পাকা ধানগাছের গোড়ায়। উৎকট গন্ধ আর চুলকানিতে কৃষক পাকা ধান কাটতে পারছেন না। শতাধিক বিঘা জমির ধান বিসর্জন দিতে হচ্ছে চোখের জলে। কৃষকের ভাষ্য, এই কারখানা শুধু তাদের মুখের খাবারই কেড়ে নেয়নি; নিয়েছে গবাদি পশুরও। ঘটনাটি ঘাটাইল উপজেলার লক্ষিন্দর গ্রামের।
টিলার ওপর জৈব সার কারখানা। নিচে দুই ফসলি জমি, যা স্থানীয়দের কাছে বাইদ (পাহাড়ি নিচু জমি) নামে পরিচিত। এই জমিতে ধানের ভালো ফলন হয়। লক্ষিন্দর গ্রামের সেই বাইদ ঘেঁষে ২০২৪ সালে গড়ে ওঠে কারখানাটি। কোথাও কোনো নামফলক নেই। তবে স্থানীয়রা জানান, এটি ওয়েসিস গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। জৈব সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় মুরগির বিষ্ঠা, সঙ্গে মেশানো হয় ছাই ও কাঠের গুঁড়া। গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, খোলা জায়গায় বিষ্ঠা শুকানো এবং মেশানোর কাজ করছেন শ্রমিকরা। স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে স্তূপ করে রাখা মুরগির বিষ্ঠা পাশে ধানের জমিতে চলে যায়।

কৃষক আব্দুল হালিম জানান, তাঁর প্রায় তিন বিঘা জমির ধান কাটতে পারছেন না। ধানক্ষেতে হাঁটুসমান মুরগির বিষ্ঠা। ধান যেমন কাটতে পারছেন না, তেমন ওই জমির খড়ও গরু খাবে না। ৭ শতাংশ জমির ধান কাটতে শ্রমকিদের পাঁচ হাজার টাকায় চুক্তি দিয়েছিলেন। দুর্গন্ধ ও চুলকানির কারণে পাঁচ মিনিট ক্ষেতে থেকে চলে আসেন শ্রমিকরা।
কৃষক মামুন মিয়া জানান, কারখানার বিরুদ্ধে কথা বললে কারখানার কোনো লোক কিছু বলেন না। তবে হুমকি দেন স্থানীয় আব্দুল গফুর নামে এক লোক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই স্থানে কারখানা স্থাপনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছেন গফুর। 

কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাগো সব ধান শেষ। ধানগাছের গোড়া পচে গেছে। দুই-এক দিনের মধ্যে সব ধানগাছ নেতিয়ে পড়বে। সেগুলো আর কাটা যাবে না।’
কারখানা ঘেঁষেই ফিরোজা বেগমের ঘর। তিনি জানান, দুর্গন্ধের কারণে তাঁর বাড়িতে মশা-মাছি বেড়ে গেছে। দুই দিন পরপর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় তাঁর মেয়ে। তার সেবা করতে গিয়ে তিনিও ওই রোগে আক্রান্ত হন। ফিরোজার ঘরে গিয়ে দেখা যায় মাছি ভন ভন করছে। স্থানীয় চায়না বেগমের ভাষ্য, দুর্গন্ধে তিন বেলা ঠিকমতো খাবার খেতে পারেন না।
কারখানার অ্যাডমিন আব্দুল হাসান বলেন, জৈব সার তৈরির জন্য তাদের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে। নিয়ম মেনেই সার তৈরি করা হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে মুরগির বিষ্ঠা ধানক্ষেতে গেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ের পাশেই ওই কারখানা। দুর্গন্ধে টেকা যায় না। কৃষকের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। 
ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নয়ীম মোহাম্মদ সোহেল জানান, মশা-মাছি খাবারে বসার কারণে ডায়রিয়া হতে পারে। দুর্গন্ধ ছড়ালে শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি এবং চর্মরোগ হতে পারে। পোলট্রি বর্জ্যের মধ্যে আছে ভারী ধাতু, যার মাধ্যমে ক্যান্সার জাতীয় রোগ হতে পারে।
টাঙ্গাইল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহিরুল ইসলামের ভাষ্য, ওই জৈব সার কারখানার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শন করে এক মাস আগে ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়েছে। সেই সময় এলাকাবাসী কোনো অভিযোগ করেনি। কৃষকের যদি ক্ষতি হয়ে থাকে, আর দুর্গন্ধ ছড়ালে পুনরায় পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘাটাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান বলেন, কারখানার বর্জ্যে ধানগাছের গোড়া অনেকটাই পচে গেছে। প্রতিবছর ওই কারখানার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×