ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে শুধু প্যাসিফিকে ফেরাটা কিসের বার্তা দেয়
এইচ. এম. সাব্বির হোসেন
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ১৭:১৪
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড আবার পুরোনো নাম ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডে ফিরে যাওয়াকে অনেকের কাছে হয়তো সামান্য নাম পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নামেরও গুরুত্ব আছে। একটি রাষ্ট্র কোন অঞ্চলকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, কোথায় ঝুঁকি দেখছে এবং কাদের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক– এসবই অনেক সময় নামের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়।
ওয়াশিংটনের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে কমান্ডের দায়িত্ব, কার্যপরিধি কিংবা অংশীদারিত্বে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর আওতাও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্তই থাকবে। তবে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই পরিবর্তনের বার্তা আরও গভীর। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিস্তৃত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার চেয়ে এখন তাদের প্রধান মনোযোগ প্যাসিফিক অঞ্চল, চীন, তাইওয়ান এবং নিজেদের সামরিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্রপথের দিকে।
বাংলাদেশের উচিত এই পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা। ২০১৮ সালে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল এই ধারণা সামনে রেখে যে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর এখন একটি অভিন্ন কৌশলগত পরিসরে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি এশিয়া-সংক্রান্ত মার্কিন কৌশলে ভারতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গড়ে ওঠা বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ভারতকে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এখন ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দেওয়া, মার্কিন কর্মকর্তারা নীতিগত পরিবর্তনের কথা অস্বীকার করলেও ভিন্ন এক বার্তাই বহন করছে।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভারতের প্রতি এর প্রতীকী বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ভারতকে এশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখেছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা ভারতকে জাপান, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে একই কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে স্থান দিয়েছিল। এর ফলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব যেমন বেড়েছিল, তেমনি ভারতের কূটনৈতিক মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছিল।কিন্তু প্যাসিফিক কমান্ডে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেন ভারতকে জানিয়ে দিচ্ছে, তার গুরুত্ব এখনও রয়েছে, তবে তা সীমাহীন নয়। ভারত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মার্কিন সামরিক মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু আর নয়। বরং ভারতকে নিজের প্রতিবেশ সামলানো, ভারত মহাসাগরে অধিক দায়িত্ব নেওয়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বেশি বোঝা বহনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এটি ভারতের জন্য অস্বস্তিকর হলেও বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্যাসিফিক অঞ্চলে বেশি মনোযোগ দেয় এবং ভারত মহাসাগরের অনেক দায়িত্ব ভারতের ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও অভিবাসনের মতো নানা কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থিতিশীল সম্পর্ক অপরিহার্য। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশও চায়, বঙ্গোপসাগর এমন একটি অঞ্চল না হয়ে উঠুক যেখানে একক কোনো আঞ্চলিক শক্তি নিয়ম নির্ধারণ করবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার পশ্চিম প্যাসিফিকে চীনকে ঘিরে। তাইওয়ান, ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন, জাপান, ফিলিপাইন, গুয়াম এবং যেসব জলসীমায় মার্কিন ও চীনা বাহিনীর মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে– সেসব এলাকাই এখন তাদের প্রধান মনোযোগের কেন্দ্র। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ছেড়ে যাচ্ছে না; বরং এশিয়ায় তার মনোযোগের পরিধি সংকুচিত করছে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শেষ করছে না; বরং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রগুলোতে তা কেন্দ্রীভূত করছে। এই পরিবর্তনের কয়েকটি তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বঙ্গোপসাগর হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের মনোযোগ আগের তুলনায় কম পাবে, যদি না ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে পারে যে এই অঞ্চল তাদের স্বার্থের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, বন্দর, সমুদ্রপথ, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ভূমিকা, জনসংখ্যা এবং ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সামুদ্রিক পথের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান লেনদেনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় শুধু গুরুত্ব থাকাই যথেষ্ট নয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা, মানব পাচার দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি কার্যকর অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত মহাসাগরে প্রতিযোগিতা বাড়লেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনা কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের পক্ষে ভারতবিরোধী, চীনবিরোধী কিংবা অন্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শক্তি ভারসাম্যের নীতিতে। সামুদ্রিক সচেতনতা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা যেমন জরুরি, তেমনি নির্ভরশীলতায় না গিয়ে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সার্বভৌম স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভারতের সঙ্গে বাস্তবধর্মী সম্পর্ক গভীর করতে হবে। পাশাপাশি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আসিয়ান ও ইউরোপের সঙ্গে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও আরও সক্রিয়ভাবে বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে বাংলাদেশ। এই সংকট মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানব পাচার, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল যদি প্রধানত প্যাসিফিককেন্দ্রিক হয়ে যায়, তাহলে এই মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট যথেষ্ট গুরুত্ব নাও পেতে পারে। ফলে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় কূটনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, আসিয়ান এবং জাতিসংঘের এজেন্ডায় মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যুকে ধরে রাখতে হবে।
চতুর্থত, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সম্ভাব্য উষ্ণতা দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। যদি ওয়াশিংটন ভারতকে বিশেষ কৌশলগত অংশীদারের পরিবর্তে অনেক অংশীদারের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তার স্বাধীনতা বাড়বে। আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা চীনের পশ্চিমমুখী করিডর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রয়োজনে এটি সহায়ক হতে পারে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের উষ্ণতা ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এতে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে মাথা চাড়া দিতে পারে। বাংলাদেশের উচিত হবে এসব প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে প্রতিটি সম্পর্ককে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা।
এই নাম পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ কমান্ডের কার্যপরিধি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও বলছে, তাদের প্রতিশ্রুতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এই পরিবর্তনকে গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় প্রতীকই ভবিষ্যৎ নীতির পূর্বাভাস দেয়। একটি নতুন নাম ধীরে ধীরে বাজেট, সামরিক পরিকল্পনা, বৈঠকের অগ্রাধিকার এবং কূটনৈতিক আচরণকেও প্রভাবিত করতে পারে।
মূল শিক্ষা একটাই– যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটি নাম পরিবর্তন করেছে, কিন্তু এর পেছনের কৌশলগত মানচিত্রটি পড়তে হবে অঞ্চলটির দেশগুলোকেই। এখন ওয়াশিংটনের প্রধান মনোযোগ প্যাসিফিক। ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আরও বেশি দায়িত্ব নিজেকেই বহন করতে হবে। আর দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বার্তা হলো– বৃহৎ কৌশলগত প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে হয়তো সামনে অপেক্ষা করছে আরও বেশি লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি। বাংলাদেশের জন্য এর জবাব ভয় নয়, বরং কৌশলগত পরিপক্বতা। যখন বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের অগ্রাধিকার সংকুচিত করছে, তখন বাংলাদেশের উচিত নিজের বিকল্প ও সুযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত করা।
এইচ এম সাব্বির হোসাইন: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- মতামত
