সহজিয়া
আমাদের ভালো না থাকার সত্যতা স্বীকার
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৮
আমরা ভালো নেই। আমরা কি তা উপলব্ধি করি না– আমরা ভালো নেই? শুধু একটি জাতি হিসেবে নয়; একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়; বরং সমগ্র সভ্যতা হিসেবে। মানব ইতিহাসের কোথাও যেন গভীর কিছু ভুল হয়ে গেছে। আমরা এমন এক যুগে বাস করি, যেখানে প্রযুক্তি বিস্ময়করভাবে এগিয়ে গেছে। আমরা মহাসাগর পেরিয়ে মুহূর্তে কথা বলতে পারি। নক্ষত্রমণ্ডল মানচিত্রে এঁকে ফেলতে পারি। পরমাণুকে বিভক্ত করতে পারি। আমরা এমন যন্ত্র তৈরি করেছি, যা চিন্তা করতে শেখে। তবুও সর্বত্র এক গভীর অসুস্থতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। নদীগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্র ভরে যাচ্ছে প্লাস্টিকে।
শিশুরা বড় হচ্ছে পর্দার আলোয়। কিন্তু অর্থের অভাবে; জীবনের গভীরতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষের হাতে এত সম্পদ জমা হয়েছে, তা পুরো জাতির সম্পদের চেয়েও বেশি; আর লাখ লাখ মানুষ এখনও প্রতিদিন জীবিকার সংগ্রামে লড়ছে। আমরা একে বলি উন্নয়ন। কিন্তু সত্যিই কি এটি উন্নয়ন? নাকি আমরা শুধু জীবনকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তুলেছি?
বাংলাদেশে এই অসুস্থতার চিহ্ন আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অসংখ্য মানুষ এখনও দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে; বহু দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরও। সম্পূর্ণ জনপদ এখনও বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকিতে। তরুণ প্রজন্ম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি, একই সঙ্গে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সংঘাত জনজীবনের বড় অংশ দখল করে আছে।
শিল্পী, সংগীতশিল্পী, লেখক ও স্বাধীন চিন্তাশীল মানুষ প্রায়ই এমন এক বাস্তবতায় আটকে পড়েন, যেখানে শিল্প নিজেই একটি সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। সংস্কৃতি হয়ে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্র। সৃজনশীলতা সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ভয় ধীরে ধীরে কৌতূহলের জায়গা দখল করে নেয়। যখন জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল– কীভাবে সৌন্দর্য, জ্ঞান এবং বোঝাপড়াকে লালন করা যায়, তখন আমরা আরও বেশি করে পরিচয়, মতাদর্শ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আটকে পড়ি। এটি শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়। একই রোগ বিশ্বে নানারূপে ছড়িয়ে আছে। কোথাও সরকার সেন্সরশিপ প্রয়োগ করে, কোথাও করপোরেট শক্তি মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। কোথাও মিডিয়া ব্যবস্থা ক্রোধ ও বিভাজনকে পুরস্কৃত করে। সবখানেই শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আর সাধারণ মানুষ ক্লান্ত, বিভ্রান্ত ও বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে এমন এক সভ্যতা তৈরি হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে নিজেরই বিরুদ্ধে কাজ করা একটি জীবের মতো হয়ে উঠছে। যে পরিবেশ আমাদের জীবন ধারণের ভিত্তি, আমরা সেটিকে ধ্বংস করছি। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, সেটিকেই দূষিত করছি। যে মাটি আমাদের খাদ্য দেয়, সেটিকে নিঃশেষ করছি। আমরা সম্প্রদায়কে মুনাফার জন্য ত্যাগ করছি। আমরা সত্যকে প্রচারের জন্য ত্যাগ করছি। আমরা প্রজ্ঞাকে বিনোদনের জন্য ত্যাগ করছি। এটি যেন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে মানবতা নিজেই নিজের হোস্টের বিরুদ্ধে কাজ করা এক ভাইরাসে পরিণত হয়েছে।
তবুও ভাইরাস প্রশ্ন করে না। ভাইরাস আত্মজিজ্ঞাসা করে না। ভাইরাস তার পথ পরিবর্তন করে না। কিন্তু মানুষ পারে। আমরা যে এই পৃথিবীর জন্য শোক অনুভব করি, সেটিই প্রমাণ করে– আমাদের ভেতর এখনও কিছু সুস্থতা বেঁচে আছে।
আমরা দেখি শিল্পীরা এখনও গান তৈরি করেন; কবিরা এখনও কবিতা লেখেন; কৃষকরা এখনও বীজ বপন করেন; মায়েরা এখনও সন্তানকে ভালোবাসেন; সাধারণ মানুষ এখনও অপরিচিত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এসবই প্রমাণ করে– অন্ধকার সম্পূর্ণ হয়ে যায়নি।
অন্ধকার বাস্তব। কিন্তু তার বিপরীতে প্রতিরোধও বাস্তব। আমাদের সামনের চ্যালেঞ্জটি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি সভ্যতাগত। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো সমাজ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর টিকে থাকতে পারে না। কোনো জাতি শুধু স্লোগানের ওপর টিকে থাকতে পারে না। কোনো জনগোষ্ঠী শুধু ভয়ের ওপর টিকে থাকতে পারে না।
আমাদের প্রয়োজন সৌন্দর্য; প্রয়োজন সংগীত; প্রয়োজন সম্প্রদায়; প্রয়োজন সত্য। আমাদের প্রয়োজন সুস্থ নদী, সুস্থ বন; সুস্থ পরিবার, সুস্থ মন। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সাহস করে স্বীকার করতে হবে, যা এখন স্পষ্ট– আমরা ভালো নেই। যতক্ষণ আমরা এই সত্যকে সৎ ভাবে গ্রহণ করতে না পারি, ততক্ষণ বাংলাদেশ কিংবা পুরো বিশ্ব সেই নিরাময়ের পথে এগোতে পারবে না, যার জন্য তারা গভীরভাবে তৃষ্ণার্ত।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- শিল্পী
