ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

চারদিক

অটোরিকশা-ইজিবাইকের বিস্তার 

অটোরিকশা-ইজিবাইকের বিস্তার 
×

সোহেল নওরোজ

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৮

ঢাকা ও দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে তিন চাকার যানবাহনের বিস্তার এখন গভীর সমস্যা। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও সহজ যানবাহনের অবাধ চলাচল নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপের মধ্যে ফেলেছে। স্বল্প দূরত্বে চলাচল, অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে যাত্রী পরিবহন এবং তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে এসব যানের চাহিদা রয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল, অদক্ষ চালক, দুর্বল কাঠামো এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে তিন চাকার যান এখন নগরবাসীর জন্য বহুমুখী বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তুলনামূলক কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে তিন চাকার এসব যান জনপ্রিয় হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে গুরুতর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাজনিত সংকট। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার। নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনা কমিশনের অনুমান অনুযায়ী দেশে ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান রয়েছে, যা মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত। দিন দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। আগে যারা ক্ষেত-খামারে কাজ করত কিংবা গ্রামগঞ্জে দোকান চালাত; তারাও বাড়তি পারিশ্রমিক, তুলনামূলক কম পরিশ্রম ও অবাধ হওয়ার কারণে শহরে এসে তিন চাকার রিকশা বা ইজিবাইক চালনা বেছে নিচ্ছে। এ প্রবণতা কতটা ভয়ংকর তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

তিন চাকার যানের অধিকাংশ চালকের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নেই। অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গাড়ি চালানো শেখেননি এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই সীমিত। বৈধ চালক লাইসেন্স ছাড়াই অনেকে যাত্রীবাহী যান চালাচ্ছেন। সিগন্যাল, লেন, জেব্রা ক্রসিং কিংবা সড়কের চিহ্নের প্রতি তাদের কোনো গুরুত্ব বা দৃষ্টি নেই।

ট্রাফিক সিগন্যাল লাল থাকা অবস্থায় ফাঁক পেলেই সামনে চলে যাওয়া তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এতে শুধু নিজের যাত্রী নয়; পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং অন্যান্য গাড়ির যাত্রীরাও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে।

তিন চাকার যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ না থাকায় যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করা হয়। মোড়, সিগন্যাল, সেতুর মুখ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যস্ত বাজারের সামনে হঠাৎ গাড়ি থামানো যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত। ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ ব্রেক করা বিপজ্জনক। অনেক সময় যাত্রী দেখামাত্র চালক সড়কের মাঝখানেই ব্রেক করেন। আবার নির্ধারিত স্ট্যান্ড না থাকায় একই স্থানে অসংখ্য অটোরিকশা ও ইজিবাইক দাঁড়িয়ে রাস্তার বড় অংশ দখল করে রাখে। এতে পেছনের যানবাহনের গতি বাধাগ্রস্ত, দীর্ঘ যানজট সৃষ্টিসহ মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। 

তিন চাকার যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন নগরজীবনে শব্দদূষণ বাড়াচ্ছে। যানজটে আটকে থাকা, যাত্রী ডাকা, পথচারীকে সরানো কিংবা সামনে থাকা গাড়িকে চাপ দেওয়ার জন্য চালকরা অনবরত হর্ন বাজায়। অনেক গাড়িতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে উচ্চ শব্দের হর্ন ব্যবহার করা হয়। হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক এলাকার কাছেও এই প্রবণতা কমে না। অতিরিক্ত শব্দ শিশু, বয়স্ক, রোগী ও শিক্ষার্থীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে মানুষের শ্রবণক্ষমতা, ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।

হঠাৎ তিন চাকার সব যান বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বহু মানুষ এসব যানের ওপর জীবিকার জন্য নির্ভরশীল এবং নগরবাসীরও স্বল্প দূরত্বে এগুলো প্রয়োজন।

অটোরিকশা-ইজিবাইকের জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। প্রধান সড়ক ও অলিগলির জন্য পৃথক চলাচল নীতি তৈরি করা যেতে পারে। নির্ধারিত স্ট্যান্ড ছাড়া যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ এবং অতিরিক্ত হর্ন ও বেপরোয়া ওভারটেকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সম্প্রতি সরকারও এ ব্যাপারে বিবৃতি দিয়েছে।

আমরা চাই সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার দ্রুত বাস্তবায়ন। আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং জনসচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এসব যানকে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবহন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব।

সোহেল নওরোজ: যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
[email protected]

আরও পড়ুন

×