ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বাজেট ঘাটতি মেটাতে রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধ করা জরুরি

বাজেট ঘাটতি মেটাতে রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধ করা জরুরি
×

হোসেন জিল্লুর রহমান

হোসেন জিল্লুর রহমান

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৫১

আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে। আমরা বাজেট বক্তৃতা শুনলাম আর বরাদ্দ দেখলাম। আমি মনে করি, এখানেই বাজেটের শেষ নয়। এখানে আরও দুটি বিষয় যুক্ত করা সময়ের দাবি। একটি হলো, বাস্তবায়নের রোডম্যাপ। বাস্তবায়ন মানে কেবল এটা নয় যে, টাকা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া; বরং বরাদ্দের বিন্যাস। অর্থাৎ কোথায় খরচ হবে এবং কীভাবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি মনিটরিং। মানে বাজেট কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, সময়ে সময়ে তার তদারকি। এখানে একটা সূচকের রূপরেখা তৈরি করা দরকার। তিন মাস পরপর তদারকি হতে পারে। জুনে বাজেট উপস্থাপন ও সংসদে পাস হয়ে যাওয়ার পর জুলাই থেকে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ও সূচকের অগ্রগতির তদারকি শুরু হবে। এই তদারকি কিংবা সূচক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরাও সরকারকে সহযোগিতা করতে পারি। 

বাজেটে বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়। কিন্তু বৈষম্যের বিষয় আরেকটু কৌশলগত পর্যায়ে ঠিক করা দরকার। কেবল প্রান্তিক গোষ্ঠীর ওপর কিছু অতিরিক্ত ভাতা দিলেই হবে না। এখানে আরও গভীর মনোযোগ দিতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেরও মূল স্পিরিট ছিল বৈষম্য নিরসন। বৈষম্যগুলো খাত অনুযায়ী দেখতে হবে। যেমন কৃষক বাজেটের সুফল পাবে কিনা। আমরা দেখছি, শিক্ষায় সরকার ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাবের কথা বলছে। গণস্বাস্থ্যে আমাদের কেবল চিকিৎসক কিংবা ওষুধনির্ভর প্রাইমারি হেলথকেয়ার জরুরি না। আমাদের কম্প্রিহেনসিভ একটা কমিউনিটি অ্যাপ্রোচ দরকার। অনুরূপভাবে শিক্ষায় ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাবের আওতায় প্রযুক্তিই সব সমাধান করে দেবে না। আমরা বারবার দেখেছি, যথেষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকলে এবং সেই শিক্ষককে একটা মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে না পারলে এই প্রযুক্তি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান করা যায় না। 

বাজেট বক্তৃতায় ১০টি ভিশনের কথা বলা আছে। সেখানে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি সেভাবে আসেনি। অথচ সফল বাজেট বাস্তবায়ন এর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অধীনে যে ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড দেওয়া হবে, সেখানে দক্ষ স্থানীয় সরকারের উপস্থিতি না থাকলে এসব কার্ডের সুবিধাভোগী নির্ধারণে সমস্যা থেকে যাবে।  

বাজেট সাধারণত এক বছরের বিষয়। এবারের প্রস্তাব, যেমন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য। কিন্তু এবারের বাজেট বক্তৃতায় মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের কথাও আছে। এই মধ্যমেয়াদি কৌশল নির্ধারণে নতুন পরিস্থিতি আমলে নিতে হবে। যেমন কৃষির মধ্যে কী পরিবর্তন এসেছে; আমাদের গ্রামাঞ্চলে নতুনত্ব কী এসেছে; জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কী ধরনের নতুন হটস্পট তৈরি হচ্ছে, তা জানা জরুরি। বাজেটের তৃতীয় অধ্যায়ে এই মধ্যমেয়াদি কৌশলের বিষয় এলেও সেখানে এসব বিষয়ে অতটা জোরালো বয়ান দেখিনি। এই বাজেট পাস হওয়ার পর বাস্তবায়নের রোডম্যাপে এগুলোর প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে।

শিক্ষায় কিছু সূচক এখন আর খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন কত শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক পর্যায় সম্পন্ন করেছে। আগে আমাদের এনরোলমেন্টের হার খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপেমেন্ট গোল- এমডিজির সময়ে আমরা এনরোলমেন্ট রেট নিয়ে খুব খুশি ছিলাম। এখন কমপ্লিশন রেট নিয়েও আমরা খুশি, কিন্তু এটিই সব নয়। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি রয়ে গেছে। স্কুলের ১১-১২ বছর সম্পন্ন করার পরও অনেকের দক্ষতার মান পাঁচ-ছয় বছরের। এই ঘাটতি বোঝা জরুরি। শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও এই উপলব্ধি না হলে সংকট থেকে যাবে। কারণ কত শতাংশ শিক্ষা সম্পন্ন করল, তার চেয়ে জরুরি কত শতাংশ যথাযথ শিখন অর্জন করল। অনুরূপ কর্মসংস্থানের বিষয়ও ভাবতে হবে। 

স্বাস্থ্য খাতেও অনুরূপ উদ্বেগের জায়গা আছে। আমরা যদি শুধু টেকনোলজি-নির্ভর কিছু জায়গায় বরাদ্দ ব্যয় করি আর পুরো প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করি তাতে পুরো বরাদ্দ খরচ হবে বটে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল আসবে না। বাজেট আরও বড় করে খরচ করার চেয়ে দক্ষভাবে খরচ করা গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে বাজেট বাস্তবায়নই বড় বিষয়। তবে এটা দুটো ট্রেনিং বেশি দিয়ে হবে না।
তিনটি রাষ্ট্রীয় ব্যাধি আমাদের সব সদিচ্ছাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে– নাগরিকদের সদিচ্ছা, সরকারের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা। এই তিনটি রাষ্ট্রীয় ব্যাধিকে আমাদের জোরালোভাবে আনা দরকার। দুর্নীতি নিয়ে খুব আলোচনা হয়। ১৫ টাকার খরচ ১৫ টাকা হলো কিনা, নাকি এর মধ্যে পাঁচ-ছয় টাকা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এই রাষ্ট্রীয় ব্যাধি নিয়ে সবাই বলে এবং সিভিল সোসাইটিও এ বিষয়ে অনেক মনোযোগী। কিন্তু সমগুরুত্বপূর্ণ কিংবা আরও বড় দুটি রাষ্ট্রীয় ব্যাধিও বিদ্যমান। একটি হচ্ছে বাস্তবায়ন ব্যর্থতা। আমরা দেখেছি, ঢাকা ওয়াসার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তথা পানি শোধনাগার প্রকল্পের বরাদ্দ শুরু হয়েছে ২০১৫ সালে। এই প্রকল্পের জন্য ২০২৬ সালেও বরাদ্দ আছে। এই যে দীর্ঘসূত্রতা তথা সময়মতো শেষ করতে না পারা, এই বাস্তবায়ন ব্যর্থতাকে দুর্নীতির সমগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আমাদের নিয়ে আসতে হবে এবং সেখানে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

তৃতীয় রাষ্ট্রীয় ব্যাধিটি হচ্ছে অপচয়। শুধু অপ্রয়োজনীয় খরচ নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানও আমরা তৈরি করে বসে আছি, যা অপচয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সাম্প্রতিক একটা গবেষণা প্রতিবেদন বেরিয়েছে, সেখানে দেখা গেছে ১২২টির মতো রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য মাত্র ৩৭টি শুধু লাভজনক। এর মধ্যে ২২টায় কোনো কাজই হচ্ছে না অর্থাৎ অকার্যকর। কাল যদি এসব অকার্যকর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে সেখান থেকে যে টাকা বাঁচবে, তা দিয়েও বাজেট ঘাটতি অনেকটা পূরণ করা সম্ভব। অপচয়ের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প একই মাপকাঠিতে দেখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণও বন্ধ করা দরকার। রাষ্ট্রীয় এসব অপচয় বন্ধ হলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমবে এবং বছর বছর ঘাটতি টানতে হবে না।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) 

আরও পড়ুন

×