প্রতিক্রিয়া
শিশুরা কি আসলেই অনিরাপদ?
মুহাম্মদ আব্দুস সবুর
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৪
দৈনিক সমকালে গত ৯ জুন প্রকাশিত গওহার নঈম ওয়ারার ‘শিশুদের অভয়াশ্রমে যখন শিশুরাই অনিরাপদ’ শিরোনামে নিবন্ধটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ২৭ মে ভোরে রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুর্ঘটনাবশত ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে লেখা হয়েছে এটি।
৭০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৯০টি শয্যা শিশুদের এবং ২০টি শয্যা অপুষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে নির্ধারিত। সেখানে শিশুর অভিভাবকদেরও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে রয়েছে ১০১ শয্যার নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। গওহার নঈম ওয়ারা সেই হাসপাতালকে ‘অনিরাপদ’ বলেছেন!
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি শিশুর প্রসব এবং ৯০টি নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। তার মানে, হাসপাতালটি প্রতিদিন প্রায় ১৪০ নবজাতকের সেবা দেয়। এই বিপুল সংখ্যক নবজাতকের চিকিৎসার ভরসাস্থলে এতদিন কোনো অঘটনের কথা কেউ শোনেনি। যে কোনো একটি মৃত্যুও দুঃখজনক– সে কথা স্মরণে রেখেই বলা যায়, বছরে ৫০ হাজারের বেশি নবজাতককে চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালে দুর্ঘটনাবশত ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এটাও মনে রাখতে হবে, হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে পারে শুধু; মৃত্যু ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
লক্ষণীয়, গওহার নঈম ওয়ারা তাঁর নিবন্ধে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সঙ্গে সেভ দ্য চিলড্রেন ও টাউনস্ উইমেন্স গিল্ডসের সম্পর্ক নিয়ে আংশিক সত্যের সঙ্গে আংশিক কল্পনা যোগ করেছেন। বাস্তবে ১৯৭২-৭৩ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন ইউকে ‘চিলড্রেনস নিউট্রিশন ইউনিট’ চালু করে অপুষ্টিজনিত শিশুর চিকিৎসার জন্য। ভাড়া বাড়িতে অবস্থিত এই চিকিৎসাকেন্দ্র কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করে। ১৯৮৩ সালে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ বাংলাদেশ সফরকালে এই ইউনিট পরিদর্শন করেন। সেখানকার কর্মীরা ভাড়া বাড়িতে চিকিৎসা প্রদানের অসুবিধার কথা তুলে ধরলে রানী তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এইচএম এরশাদকে জানান, বাংলাদেশ সরকার জমি দিলে তিনি ভবন নির্মাণ করে দেবেন। পরে মগবাজারে একটি জমি সরকার নামমাত্র মূল্যে সেভ দ্য চিলড্রেনকে প্রদান করে। রানীর কন্যা প্রিন্সেস এ্যান টাউন উইমেন্স গিল্ডসকে অনুরোধ করলে তারা ‘ঢাকা আপিল’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থে ভবন নির্মাণ করে দেয়।
১৯৯৫ সালে এসে সেভ দ্য চিলড্রেন উপলব্ধি করে, শুধু ৬০ শয্যার হাসপাতালের মাধ্যমে বাংলাদেশে অপুষ্টি সমস্যার ফলপ্রসূ সমাধান সম্ভব না। চিলড্রেনস নিউট্রিশন ইউনিটে সংস্থার বার্ষিক বাজেটের ৮০ শতাংশই খরচ হওয়ার ফলে অন্যান্য কাজেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে সংস্থাটি নিউট্রিশন ইউনিট পরিচালনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু টাউন উইমেন্স গিল্ডের শর্ত ছিল– তাদের অর্থায়নে নির্মিত ভবন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সহযোগী খোঁজার পরিক্রমায় সেভ দ্য চিলড্রেন আদ্-দ্বীনকে চিহ্নিত করে কতিপয় শর্ত দিয়ে প্রথমে অস্থায়ীভাবে এবং পরে স্থায়ীভাবে আলোচ্য স্থাপনা ও ভূমি হস্তান্তর করে। উল্লেখ্য, বর্তমান আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধিকাংশ স্থাপনা ও ভূমি পরে সম্প্রসারিত।
চিলড্রেন্স নিউট্রিশন ইউনিট স্থাপনে ১৯৭৪ সালে থেকে টাউন উইমেন্স গিন্ডসের সম্পৃক্ততা এবং আদ্-দ্বীনকে জমি ও স্থাপনা প্রদানের যে কথা গওহার নঈম ওয়ারা লিখেছেন, তার সাথে বাস্তবের মিল নেই।
তিনি শেরেবাংলা নগরে শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিার যে কাহিনি বর্ণনা করেছেন, তাও সত্যের ব্যত্যয়। প্রকৃত সত্য হলো, স্বাধীনতার পর তখনকার শিশু চিকিৎসক তোফায়েল আহমেদ ধানমন্ডিতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়িতে শিশু হাসপাতাল চালু করেন। ৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর তাঁর বড় ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দেশে ফিরে বাড়ির দখল নিলে শিশু হাসপাতালটি অস্থায়ীভাবে পঙ্গু হাসপাতালের একাংশে ঠাঁই নেয়। সুতরাং শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মগবাজারের নিউট্রিশন ইউনিটের সম্পৃক্ততার কথা সঠিক নয়।
গওহার নঈম ওয়ারা লিখেছেন, ১৯৭৭ সালে শেরেবাংলা নগরে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল চালু হলে বন্ধ হয়ে যায় মগবাজারের সিএনইউ। বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সিএনইউ সেভ দ্য চিলড্রেনই পরিচালনা করেছে। ওই বছর আদ্-দ্বীনকে সহযোগী সংগঠন নির্বাচিত করে সেটা হস্তান্তরিত হয় ১৯৯৭ সালে।
এসব তথ্য বিভ্রান্তির সঙ্গে গওহার নঈম ওয়ারা যেভাবে আদ্-দ্বীনের মালিকপক্ষকে ‘মুনাফামনস্ক’ বলেছেন, সেটাও সত্যের অপলাপ।
ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর: সেভ দ্য চিলড্রেনের ১৯৮৫-২০০০ সালে স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান
- বিষয় :
- হাসপাতাল
