ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

দেরিতে আসছে রোগী, ছড়াচ্ছে হাম

দেরিতে আসছে রোগী, ছড়াচ্ছে হাম
×

নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেঝেতে বৃহস্পতিবার শিশুদের নিয়ে স্বজনেরা সমকাল

মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

১০ দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ বছর বয়সী তাসফিয়া। তার উপসর্গ হামের। শুরুতে জ্বর ধরা পড়লে স্থানীয় কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন স্বজনেরা। তার পাশে আছেন মা তুফা আক্তার। তাদের বাড়ি পাশের হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরে। তুফা আক্তার জানান, শুরুতে কবিরাজের কাছ থেকে পানিপড়া নিয়ে খাইয়েছেন মেয়েকে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে নাসিরনগর হাসপাতালে এনে ভর্তি করেন। 

গতকাল বৃহস্পতিবার এই উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২০ রোগীর মধ্যে ৩৬ শিশুর শরীরেই হামের উপসর্গ। এক মাসে এখানে ১৪৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে চারটি শিশু। এরা হলো হুজাইফা (৪), সজীব (২), ছাফওয়ান (১) ও নাভা আক্তার (২)। একজন এই হাসপাতালে মারা গেছে। অন্যরা ঢাকার হাসপাতালে বা সেখানে নেওয়ার পথে মারা যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মারা যাওয়া শিশু ও হামে আক্রান্ত শিশুর সিংহভাগই প্রতিষেধক টিকা নেয়নি। এ জন্য অভিভাবকদের অসচেতনতা ও কৃসংস্কারকে দায়ী করেন তারা। দেরি করে রোগী নিয়ে আসছেন।
চিকিৎসকের কথার প্রমাণ মেলে ললিতা বেগমের কথায়। উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের শ্রীঘর 
গ্রামের এই গৃহবধূ ১৫ দিন ধরে মেয়ে তাসফিয়া আক্তারকে (৫) নিয়ে আছেন হাসপাতালে। ললিতা জানালেন, ১৭ এপ্রিল তাঁর মেয়ের শরীরে জ্বর ও গুটি বের হয়। স্থানীয় কবিরাজের ‘পানিপড়া চিকিৎসা’ দিয়েছেন এক সপ্তাহ। ধুঁকতে ধুঁকতে মেয়েটি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন নিয়ে আসেন নাসিরনগর হাসপাতালে। ২৩ এপ্রিল থেকে এখানে চিকিৎসা চলছে তার। চিকিৎসকরা সিরাপ ও মলম দিচ্ছেন তাসফিয়া আক্তারকে। 

এদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি ও চার শিশুর মৃত্যুর পর উপজেলার অভিভাবকদের মনে ভীতি ছড়িয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন শত শত শিশু জ্বর, সর্দি, শরীরে লালচে দানা, ডায়রিয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় প্রতিদিন রোগী ভর্তি হচ্ছে ধারণক্ষমতার তিন গুণ। শয্যা সংকটে অনেকে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা, নামাজ ও খাবারের জায়গাতেও বিছানা পেতেছেন। 
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে, ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১২০। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়েই ভর্তি ৩৬ শিশু। চিকিৎসকরা জানান, রাতের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুর সংখ্যা আরও বাড়বে। অন্য রোগী তো আছেই। এ উপজেলার পাশাপাশি হবিগঞ্জের লাখাই, মাধবপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের রোগীও আসছে এখানে। ফলে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, গত ৩০ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত সাত দিনে হাসপাতালের বহির্বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫০-৩০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এখন বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেও এ রোগের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। 
উপজেলার ফান্দাউক ইউনিয়নের গৃহবধূ আছমা আক্তার (৪৫) শুক্রবার বিকেল থেকে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিনই তাঁর শরীরে লাল গুটি দেখা দেয়। আছমা জানান, তিনি কখনও হামের প্রতিষেধক নেননি।
পাশের লাখাই উপজেলা থেকে আসা সাইমন মিয়া বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় হামের চিকিৎসা না পেয়ে নাসিরনগর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু হাসপাতালে রোগীর এত চাপ যে, শয্যা না পেয়ে চার দিন বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছি।’

টিকার বিরুদ্ধে প্রচারণা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের বহু গুণ। অনেকেই বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার গ্রামের বড় অংশ কবিরাজ ও ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করছেন। 

গোয়ালনগর ইউনিয়নের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মাজহারুল হক বলেন, ‘আমাদের গ্রামে কিছু ছেলে ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছে– টিকা নেওয়া ধর্মীয়ভাবে উচিত না। এসব লেখা দেখে অনেক অভিভাবক টিকা নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অথচ হামের টিকা দেওয়ার জন্য আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছি।’
তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন ভলাকুট ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সহকারী পলাশ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, শিশুদের অভিভাবকরা টিকা নিতে চান না। ধর্মীয় কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার কারণে তারা নিজেরাও নেন না, অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করেন। 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) শাখাওয়াত হোসেন জানালেন, উপজেলায় শূন্য থেকে ১১ মাস বয়সী শিশু আছে ১১ হাজার ৬৫৩ জন। গত বছর টিকার প্রথম ডোজ থেকে ১৩ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ থেকে ১৬ শতাংশ শিশু বাদ পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নমুনা সংগ্রহ করার পর্যাপ্ত কিট নেই। জেলা সদর হাসপাতালেও ছিল না। পরে আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজস্ব অর্থায়নে তিন দিন আগে ১০০ কিট কিনে এনেছেন। এর আগে ১০-১২ দিন কিটের সংকট ছিল।’
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, এক মাসে ১৪৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। হামের প্রাথমিক উপসর্গ হলো জ্বর, সর্দি, চোখ দিয়ে পানি পড়া। জ্বরের চতুর্থ দিনে শরীরে গুটি গুটি র‍্যাশ বের হয়। র‍্যাশ বের হওয়ার আগের চার দিন ও পরের চার দিন, মোট আট দিন অসুস্থ শিশু থেকে সুস্থ শিশুর শরীরেও হাম ছড়াতে পারে। এ সময় শিশুকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। 

সংকটে হাসপাতাল
হাসপাতালের বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে আরএমও শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ধারণ ক্ষমতার তিন গুণ রোগী ভর্তি হচ্ছে। রোগীর শয্যা, ওষুধ ও খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছেন না। 
এসব তথ্য নিশ্চিত করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. অদিতি রায়। তিনি হামে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অভিভাবকদের অসচেতনতা ও কুসংস্কারকে দায়ী করেন। ডা. অদিতি রায় বলেন, ‘অনেকেই টিকা নিতে চান না। এমনকি আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে তর্কে জড়ান। রোগ দেখা দিলে তারা প্রথমে কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হলে হাসপাতালে আসেন। বর্তমানে আমরা সক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ রোগীর সেবা দিচ্ছি। ফলে ওষুধ ও জনবল সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।’

আরও পড়ুন

×