ভ্যানচালককে হত্যা
‘আব্বু, মোর জন্যে দই নিয়া আসপে কখন?’
আরিফুল ইসলামের স্ত্রী শারমিন আক্তার ও কন্যা আঁখিমনি। ছবি: সমকাল
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ২১:০৯
‘আম্মু, আব্বু মোর জন্যে দই নিয়া আসপে কখন? বাড়িত আইসে না ক্যান?’ এভাবেই বারবার মৃত বাবা আরিফুল ইসলামকে খুঁজছে আড়াই বছরের শিশু আঁখিমনি। গত ৫ মে বিকেলে রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার আম্বিয়ারমোড় এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে (২৮)।
আড়াই বছরের মেয়ের কাছে বাবা ছিলেন প্রতিদিনের আনন্দ, অপেক্ষা আর নিরাপত্তার একমাত্র আশ্রয়। মেয়ের আবদারে বাবার শেষ প্রতিশ্রুতি ছিল, ‘দই আনিম এ্যালা মা।’ মেয়ের প্রশ্ন শুনে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর ধরে রাখতে পারেন না মা শারমিন আক্তার। শিশুটি তখন জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মু, কান্দিস ক্যান?’
হত্যার দিনটির কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন আরিফুলের স্ত্রী শারমিন আক্তার (২৪)। গত ৫ মে সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে কোলে নিয়ে নিজ হাতে ভাত খাইয়েছিলেন আরিফুল।
শারমিন আক্তার বলেন, সেদিন রিকশাভ্যান চালাতে বের হওয়ার সময় ছোট্ট আঁখিমনি বাবার পিছু পিছু দৌড়ে গিয়ে বলেছিল, ‘আব্বু, মোর জন্যে দই নিয়া আসিস।’ তখন মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলেছিল, ‘ঠিক আছে, দই আনিম এ্যালা মা। তুমি আম্মুর কাছে যাও।’
এটাই ছিল মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা। ওই দিন তিনি আর ফেরেননি। রাতভর ছিলেন নিথরদেহে থানা হেফাজতে। পরদিন ৬ মে বিকেলে পুলিশ ও ডাক্তারের হাত পেরিয়ে ফিরে লাশ ফিরে পায় পরিবার। সেদিন সন্ধ্যার আগে তাকে দাফন করা হয়।
কিন্তু আড়াই বছরের শিশু এখনও বুঝতে পারছে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। তাই প্রতিদিন মাকে একই প্রশ্ন করে চলছে, ‘মা, আব্বু দই নিয়া আসপে কখন?’ শারমিন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে মিথ্যা সান্ত্বনা দেন, ‘তোমার আব্বু দূরো কামোত গেইছে মা। কয়দিন পর দই নিয়া আসপে।’
গতকাল শনিবার বিকেলে আরিফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট টিনের ঘরের সামনে মাটির চুলায় ভাত বসানো। ধোঁয়া উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। নিভে যাওয়া আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছেন আরিফুলের বৃদ্ধ মা আদুরি বেগম (৫২)।
বারান্দায় বসে আছেন শারমিন। কোলে আঁখিমনি। মুখে গভীর শোক, চোখে আতঙ্ক, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
শারমিন বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। যারা আমার স্বামীকে মারছে, তাদের ফাঁসি চাই। ওর সঙ্গে আমাকে আর মেয়েটাকেও মাইরা ফেললে ভালো হতো।’
কথা বলতে বলতে তিনি জানান, আরিফুল প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত তার মা-বাবাসহ আমাদের সংসার। সন্ধ্যায় চাল-ডাল কিনে বাড়ি ফিরতেন। রান্না করে সবাই খেতাম।
শারমিন আক্তার বলেন, ‘সকাল থাকি না খায়া আছি। বাড়ির সামনে দুই ছড়া কলা ৫০০ টাকায় বিক্রি করছি। সেই টাকায় চাল আনছি। আজ শুধু ভাত রান্না হচ্ছে। এরপর কী খাবো, কীভাবে বাঁচবো— কিছুই জানি না।’
শারমিনের বাবা-মাও বেঁচে নেই। যাওয়ার মতো কোনো আশ্রয়ও নেই তার। এখন আড়াই বছরের আঁখিমনিকে কীভাবে মানুষ করবেন— সেই দুশ্চিন্তাও পিছু ছাড়ছে না।
নিহত আরিফুলের বাবা রেজাউল ইসলাম (৫৮) যেন এক জীবনে অনেক শোকের ভার বহন করছেন। চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আরিফুল ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ছেলে আদম বাদশাহ তিন বছর আগে অসুস্থতায় মারা যান। তাঁকে বাঁচাতে ১০ কাঠা আবাদি জমিসহ প্রায় সবকিছু বিক্রি করতে হয়েছিল। তৃতীয় ছেলে লাল চাঁন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন।
বৃদ্ধ বাবা-মা, প্রতিবন্ধী ভাই, স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে পুরো সংসারের ভার ছিল আরিফুলের কাঁধে।
কাঁদতে কাঁদতে বাবা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘বড় ছেলেক হারানোর ব্যথা এখনও বুক থেকে যায় নাই। ছোট ছেলে মরার শোক এই বুক কেমন করে সহ্য করবে? আরিফুল ছিল আমাদের শেষ ভরসা। এখন আমাদের দিন চলছে খেয়ে না খেয়ে।’
ওই বাবার অভিযোগ, প্রকাশ্যে নির্মমভাবে ছেলেকে হত্যা করা হলেও মূল আসামিরা এখনও ধরা পড়েনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘যদি বিচার না পাই, তাহলে পরিবার নিয়ে আত্মহত্যা করবো।’
নিহত আরিফুলের চাচা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘ঘটনার পাঁচ দিন হয়ে গেল, কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনের কর্মকর্তা পরিবারটির খোঁজ নেয়নি। তারা চরম অভাবে দিন কাটাচ্ছেন।’
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আরিফুল খুব ভালো মানুষ ছিলেন। এমন একজন নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে।’
গত ৫ মে বিকেলে বদরগঞ্জের কলেজপাড়া গ্রামের ফিরোজ শাহ ওরফে মার্ডার ফিরোজ রংপুরের আদালতে হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়ান পাঠানপাড়া গ্রামের মমিনুল ইসলামের সঙ্গে। এর জের ধরে বদরগঞ্জ পৌরসভার আম্বিয়ারমোড়ে মমিনুলের প্রতিবেশী রিকশাভ্যানচালক আরিফুলকে পেয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ফেলে যান দুর্বৃত্তরা।
- বিষয় :
- ভ্যানচালককে হত্যা
- রংপুর
- শিশু
