ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

রেনেসাঁ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

শিক্ষকদের বিবাদে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থী

শিক্ষকদের বিবাদে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থী
×

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১১:০২

একদিকে বিশাল চারতলা ভবন, সুপরিসর শ্রেণিকক্ষ আর আধুনিক অবকাঠামো। অন্যদিকে সুনসান নীরবতা আর শিক্ষার্থীশূন্য এক ভুতুড়ে পরিবেশ। এই চিত্র ময়মনসিংহের সদর উপজেলার সিরতা ইউনিয়নের চর আনন্দীপুর গ্রামের রেনেসাঁ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের। কয়েক বছর আগেও যেখানে ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত ছিল বিদ্যালয়টি, বর্তমানে সেখানে ছাত্রীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬ জনে। 

ভিযোগ উঠেছে, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের মাঝে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্যালয়ের বরখাস্ত সহকারী প্রধান শিক্ষকের অনিয়ম, নিয়োগ জালিয়াতি এবং তাঁর পরিবারের দাপটে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে প্রতিষ্ঠানটি। এ ব্যাপারে গত ২ মে কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রেনেসাঁ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সালে নিম্নমাধ্যমিক এবং ২০২০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয়। সংকটের সূত্রপাত হয় ২০০৪ সালে, যখন তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির আত্মীয় হওয়ার সুবাদে কামরুন্নাহারকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তৎকালীন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ওই সময় নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে এই পদের বিধান নেই জানিয়ে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা অমান্য করা হয়। এমনকি ওই সময়ে কামরুন্নাহারের প্রয়োজনীয় বিএড প্রশিক্ষণও ছিল না।

প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে নথিপত্রে স্বাক্ষর আদায় করেন কামরুন্নাহার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ২০১২ সালে তিনি প্রধান শিক্ষক ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নিজেকে সহকারী শিক্ষক (শাখা শিক্ষক) হিসেবে দেখিয়ে এমপিওভুক্ত হন, যদিও এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ে কোনো অতিরিক্ত শাখার অনুমোদন নেই। দীর্ঘ এক দশক ধরে জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুন্নাহারের নিয়োগ বাতিল করেন। একই সঙ্গে এতদিন পর্যন্ত উত্তোলিত সমস্ত বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে বরখাস্ত হওয়ার পর কামরুন্নাহার এবং তাঁর স্বামী স্থানীয় প্রভাবশালী আশরাফুল আলমসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের অভিযোগ, কামরুন্নাহারের পরিবার নিয়মিত বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে বাধা দিচ্ছেন। এছাড়া ছাত্রীদের স্কুলে না আসতে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এমনকি নতুন কোনো শিক্ষক এই বিদ্যালয়ে চাকরি করতে এলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে অভিভাবকরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে সন্তানদের এই স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর।

প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন- কামরুন্নাহারের স্বামী, চাচা শ্বশুর ও দেবর মিলে একটি নিজস্ব পকেট কমিটি গঠনের জন্য তাঁকে চাপ দিচ্ছেন। তাঁর আশঙ্কা, এই চক্রটি একবার কমিটির নিয়ন্ত্রণ পেলে তাঁকে বরখাস্ত করে জালিয়াতির সমস্ত প্রমাণ মুছে ফেলবে এবং বিদ্যালয়টিকে পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করবে।

জানা গেছে, সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুন্নাহারের সঙ্গে ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক শাহবাজ মিয়ারও এমপিওভুক্তি হয়। প্রধান শিক্ষক জানান, সহকারী শিক্ষক শাহবাজ মিয়ার জালিয়াতির বিষটিও তদন্তে ধরা পড়ে। এই বিষয়টিও শিগগিরই মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুন্নাহারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ দেন।

প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, শারীরিক শিক্ষার নূরজাহান বেগম, ইংরেজি বিষয়ের শাহবাজ মিয়া ও কৃষিশিক্ষার শিক্ষক চন্দন কুমার সরকার ও আয়া মালতী রবি দাস ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে এখন পর্যন্ত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন না। প্রধান শিক্ষককে বেকায়দায় ফেলার উদ্দেশ্যেই তারা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন না বলেও অভিযোগ তাঁর। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ রয়েছে। তবে এনটিআরসিএ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন নতুন শিক্ষক একই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে যোগদান করে নিয়মিত পাঠাদান করে আসছেন।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিদ্যালয়ের অরাজকতা ও শিক্ষার্থীশূন্য পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায়, নারী শিক্ষার প্রসারে নির্মিত প্রতিষ্ঠানটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কামরুন্নাহারের স্বামী, চাচা শ্বশুর ও দেবর মিলে একটি নিজস্ব পকেট কমিটি গঠনের জন্য তাঁকে চাপ দিচ্ছেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করায় তাঁকে ও নতুন শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছেন।

আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক আফসানা শিমু হতাশা প্রকাশ করে জানান, স্কুলে দলাদলি আর এলাকার নেতাদের হস্তক্ষেপে অতিষ্ঠ তারা। এসব রাজনীতির কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে।

বরখাস্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুন্নাহারের ভাষ্য, এই বিদ্যালয়ে ৪৫ শতাংশ জায়গা দিয়েছেন তারা। তাঁর শ্বশুর দীর্ঘদিন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। ২০১৮ সাল থেকে কমিটি না থাকায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের স্বৈরাচারী নীতির কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৬ জনে নেমে এসেছে। শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। 
কোতোয়ালি থানার ওসি শিবিরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেয়েছেন। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহা. নাসির উদ্দীন সমকালকে জানান, এই বিদ্যালয়টিতে বিবাদমান দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রয়েছে। কয়েকদিন আগে এই দুটি পক্ষ পুনরায় অভিযোগ দিয়েছে। এগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×