ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ওমানে একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু

এক ভাইয়ের বিয়ের আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে

এক ভাইয়ের বিয়ের আনন্দ  পরিণত হলো বিষাদে
×

রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম

 চট্টগ্রাম ব্যুরো ও রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে বাড়িতে কয়েক দিন পর বিয়ের সানাই বাজার কথা ছিল, সেই বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার শব্দ। স্বজনের আহাজারিতে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে পরপারে পাড়ি দিলেন চার ভাই। দুঃখের দিন শেষে সুখের দেখা মিলল বটে, কিন্তু সেই সুখ সইল না। চার ভাইয়ের মৃত্যুতে বিষাদে পরিণত হলো এক ভাইয়ের বিয়ের আনন্দ। স্বজনের চোখে এখন শুধু অশ্রু আর চার ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষা।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজারপাড়া গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিনের পাঁচ ছেলে। তাদের মধ্যে চারজন ওমানপ্রবাসী। তারা হলেন– রাসেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। কর্মসূত্রে ওমানে দুই ভাই একই শহরে এবং অপর দুই ভাই ভিন্ন ভিন্ন শহরে বসবাস করতেন। বিয়ের বাজার করতে একত্র হয়েছিলেন তারা। গত বুধবার সেই দেশের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে চার ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ পুরো গ্রাম।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ওমানপ্রবাসী চার ভাই। এক ভাই এনামুল ইসলাম বাড়িতে থাকেন। তাদের বাবা মারা গেছেন ১৪ বছর আগে। শহিদুল ইসলামের বিয়ে ঠিক হওয়ায় আজ শুক্রবার সিরাজুলসহ দুই ভাইয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। বিয়ের কেনাকাটা করতে চার ভাই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। তাদের মা টাক্কুনি বেগমকে (৬৭) চার সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি। শুধু জানানো হয়েছে, তারা অসুস্থ। এতেই তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

বান্দারাজারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জামাল উদ্দিনের বাড়িতে নিকটাত্মীয় ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। টাক্কুনি বেগমকে জানানো হয়েছে, তাঁর চার সন্তান অসুস্থ হয়ে ওমানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতেই তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ওমানে থাকা একই এলাকার বাসিন্দা বাবুর মাধ্যমে প্রথমে দেশে পৌঁছে এই সংবাদ। পরে আরেকজন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, গত বুধবার সকাল ৮টার দিকে স্থানীয় লোকজন একটি প্রাইভেটকারের ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বিয়ের বাজার করতে যাওয়ার সময় রহস্যজনকভাবে মুলাদ্দাহ শহরে চলন্ত গাড়ির ভেতর আটকে পড়েন চার ভাই। নিঃশ্বাস নিতে না পারায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল তাদের। বাঁচার আকুতি জানিয়ে তারা মোবাইল ফোনে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন আরেক প্রবাসী চাচাতো ভাই পারভেজের কাছে। ভয়েস মেসেজে বলা হয়, ‘আমরা গাড়িতে আটকা পড়েছি, খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’ সেই চাচাতো ভাই ১০ মিনিটের মধ্যে তাদের ফোনে ফিরতি কল করলেও তাদের আর সাড়া পাওয়া যায়নি। গত মঙ্গলবার ওমানের সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ বার্তা পান পারভেজ। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরদিন বুধবার সকালে পুলিশ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে চার ভাই গাড়ির ভেতরে এসি চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এসির গ্যাস লিকেজ বা বিষক্রিয়াজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। বর্তমানে চার ভাইয়ের মরদেহ রোস্তাক থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার ভাই ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ভদ্র। চার ভাইয়ের এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে ঘরে বিয়ের আলোকসজ্জা হওয়ার কথা ছিল, সেই ঘরেই এখন নিস্তব্ধতা।
দেশে থাকা একমাত্র জীবিত ভাই মুহাম্মদ এনামুল ইসলামকে সান্ত্বনা দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমার ভাই শহিদের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আরেক ভাই সিরাজের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। কয়েকদিনের মধ্যে তাদের দুজনের দেশে ফেরার কথা ছিল। এখন আমার চার ভাইয়ের লাশ আসছে। মা অসুস্থ। এমন অবস্থা যে তাঁকে মৃত্যুর খবরটি দিতে পারছি না। এই কষ্ট কীভাবে সহ্য করব?’
রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি মো. জহির উদ্দিন বলেন, ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যুর বিষয়ে পরিবার থেকে জানানো হয়েছে। নিহতদের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য।

আরও পড়ুন

×