টিকা নিয়েও বেকায়দায় অসচ্ছল পরিবারগুলো
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামে জলাতঙ্কে মারা যাওয়া পাঁচজনের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দিয়েছে সরকার। তবে একই ঘটনায় কুকুরের কামড়ে আহত ১১ জনের কেউ সরকারি অর্থ বা চিকিৎসা সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আক্রান্ত ছয়জনের পরিবার বলছে, সরকারি হাসপাতালে না পেয়ে বাইরের দোকান থেকে কিনে জলাতঙ্কের টিকা দিতে হয়। এজন্য অসচ্ছল পরিবারগুলোকে ধারদেনা করতে হয়েছে।
গত ২২ এপ্রিল কঞ্চিবাড়ি গ্রামে ১৬ জনকে কুকুরে কামড়ায়। এর ১৪ দিন পর গত ৬ মে গ্রামের নন্দরানী ও ফুল মিয়া এবং ৮ মে রতনেশ্বর মারা যান। গত ১১ মে উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি জানার পর মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়। এরপর ১১ মে রাতে আফরোজা বেগম এবং ১৩ মে সুলতানা বেগমের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের পরিবারকেও ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়।
মৃত পাঁচজন বাদে ২২ এপ্রিল কুকুরের আক্রমণে বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, গোলেনুর বেগম, মিতু বেগম, আতিকুর মিয়া, লাবণ্য আকতার, বিজয় হোসেন, জয়নাল আবেদীন ও চাঁদনী বেগম আহত হন। তাদের মধ্যে নজরুল, আতিকুর, বিজয়, হামিদুল ও রুবিনা সুস্থ আছেন। তবে অন্যদের ক্ষতস্থান এখনও শুকায়নি। কারও কারও ক্ষতস্থানে ব্যথা আছে।
আক্রান্ত মিতু বেগমের বাবা মুনছুর আলী জানান, মেয়েকে বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে টিকা কিনে এ পর্যন্ত তিনটি ডোজ সম্পন্ন করিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্য এসে দেখে গেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা দেননি। স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো চিকিৎসকও খোঁজ নিতে আসেননি। শুধু ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী এসে খোঁজ নিয়ে গেছেন।
একই ধরনের কথা বললেন আক্রান্ত নজরুল ইসলাম (৬৫)। তিনি একজন দিনমজুর। নিজের দিনমজুরির আয় এবং ছেলেদের রোজগারে সংসার চলে। এরপরও ধারদেনা করে টিকা নিয়েছেন।
মৃত রতনেশ্বরের স্ত্রী শোভা রানী বলেন, তাঁর স্বামী কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। স্বামীর দিনমজুরির আয়ে সংসার চলত। এখন কীভাবে সংসার চলবে ভেবে পাচ্ছেন না। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ইউএনও এসে ১০ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। এর চাইতে বেশি টাকা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর আগে খরচ হয়েছে। সরকারিভাবে টিকা পেলে হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেত। এখন তাঁকে হারানোর কষ্ট সইতে হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবার চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ বছরে উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় জলাতঙ্কে কারও মৃত্যুর খবর শোনা যায়নি। কিন্তু ২২ এপ্রিলের এক ঘটনাতেই পাঁচজনের মৃত্যু হলো। উপজেলা পরিষদের অফিস সহকারী হাসান শুভ জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুরোনো উপজেলা পরিষদে কুকুরের কামড়ে ছয়জন আহত হয়েছিলেন। তারা বাইরের দোকান থেকে কিনে টিকা দিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত সুস্থ আছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, ইউএনও পাঁচ মৃতের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু আক্রান্তদের এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা দেননি। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার দিবাকর বসাক জানান, কুকুরের কামড়ে আক্রান্তদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য মেডিকেল অফিসার ডাক্তার সাইদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। গত তিন দিন থেকে টিম কাজ করছে। এ ঘটনার পর সরকারিভাবে ৩০টি জলাতঙ্ক টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। গত দুই বছরে সুন্দরগঞ্জে জলাতঙ্কে কারও মারা যাওয়ার কোনো তথ্য নেই। তবে হয়তো অনেকে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার শহিদুল্লাহ বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত চার হাজার ৮০০ জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হয়েছে। দুদিন আগে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) টিকার চাহিদা পাঠালে গতকাল বৃহস্পতিবার ১ হাজার টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কতজন মারা গেছেন, তার কোনো তথ্য সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই মৃত এবং আক্রান্তদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে আপাতত ১০ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। আক্রান্তদের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তা বিতরণ করা হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রতিদিন আক্রান্তদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগকে তদারকি করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- টিকা
