হবিগঞ্জে প্রাণ-আরএফএল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক
ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
রিসাইক্লিংয়ে তৈরি শতাধিক সামগ্রী, হচ্ছে রপ্তানিও
ভাঙাচোরা, বাতিল প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে তৈরি হচ্ছে নতুন পণ্য। গত বুধবার প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্লান্টে বর্জ্য প্লাস্টিক বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যস্ত শ্রমিকরা সমকাল
জাহিদুর রহমান, হবিগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে বিশাল শিল্পাঞ্চলে ঢুকতেই কানে আসে যন্ত্রের গর্জন। এক পাশে স্তূপ করে রাখা ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার, ফাটা বালতি, পুরোনো মোড়া, ভাঙাচোরা ড্রাম, পলিথিন, বোতলসহ অসংখ্য গৃহস্থালি সামগ্রী। দেখে মনে হয়, এগুলোর যাত্রা এখানেই শেষ। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই বোঝা যায়, এখান থেকেই শুরু হচ্ছে এসবের ‘নতুন যাত্রা’।
কারখানার কর্মীরা প্লাস্টিকের ভাঙা অংশ, বোতল ও পলিথিন একটি বিশাল মেশিনের ধাতব প্লেটে তুলে দিচ্ছেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো চূর্ণ হয়ে ছোট ছোট দানায় পরিণত হচ্ছে। অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসছে প্লাস্টিকের কুচি। পরে সেই কুচি ধোয়া, শুকানো, গলানো ও পরিশোধনের একাধিক ধাপ পেরিয়ে তৈরি হচ্ছে রেজিন। অর্থাৎ প্লাস্টিক তৈরির মূল কাঁচামাল। সেই রেজিন দিয়ে তৈরি হচ্ছে চেয়ার, বালতি, ফুলের টব, ডাস্টবিন, পোলট্রি সামগ্রী, বেলচা, গার্ডেনিং পণ্যসহ শতাধিক সামগ্রী।
হবিগঞ্জের প্রাণ-আরএফএল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ঘুরে জানা গেল, কীভাবে দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং বেজ্ড একটি সার্কুলার ইকোনমি।
বর্জ্য থেকে নতুন শিল্প
মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্লাস্টিক এমনভাবে জড়িয়ে গেছে, এটি ছাড়া কল্পনা করাও কঠিন। রান্নাঘর থেকে কৃষিক্ষেত্র, হাসপাতাল থেকে শিল্পকারখানা– সবখানেই প্লাস্টিকের ব্যবহার। হালকা ওজন, কম দাম, টেকসই গঠন এবং বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়েই এর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু এই সুবিধার বিপরীতে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট। ব্যবহারের পর প্লাস্টিকের বড় অংশই ছড়িয়ে পড়ছে খাল-বিল, নদী, ড্রেন ও উন্মুক্ত পরিবেশে। মাটির নিচে শত শত বছর থাকলেও যার ক্ষয় হয় না। নদীতে জমা হওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়। ড্রেন আটকে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। পোড়ালে তৈরি হয় বিষাক্ত গ্যাস। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই প্লাস্টিক এখন দূষণের বড় উৎস।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ২০১২ সালে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কার্যক্রম শুরু করে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ১০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা তাদের শিল্পপার্কে স্থাপন করা হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্লান্ট।
এখানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাকে আসে প্লাস্টিক বর্জ্য। গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘টেল প্লাস্টিকস’ দেশে পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার ইকোনমি কাঠামো গড়ে তোলার দাবি করছে। তাদের কার্যক্রমের বিশেষত্ব হলো, শুধু প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন নয়, বরং ব্যবহারের পর সেই পণ্য সংগ্রহ করা। আবার রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন
পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত পুরো চক্র তারা নিজেরাই পরিচালনা করছে।
মাসে প্রায় ছয় হাজার টন প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার
বর্তমানে আরএফএল গ্রুপ প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার ৭৫০ টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে। এই পরিমাণ প্লাস্টিকের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হতো। ফলে রিসাইক্লিং শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনৈতিক সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারখানার কর্মকর্তারা বলছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় কমছে। দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।
রিসাইক্লিংয়ের পরিবেশগত প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি কেজি পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক প্রায় ১ দশমিক ০৮ কেজি কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করে। কারখানার ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, প্লাস্টিক ধোয়ার সময় ব্যবহৃত তরল বর্জ্য শোধনের জন্য আলাদা ইটিপি রয়েছে। পরিশোধনের পর সেই পানি আবার রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
বর্জ্য ঘিরে গড়ে উঠছে কর্মসংস্থান
এই শিল্প শুধু পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, রিসাইক্লিং কার্যক্রমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কাজ করছে। পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের। প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে নতুন পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সংগ্রাহক। কারখানায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী কর্মীও আছেন।
টেল প্লাস্টিকস বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১২টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে শহর ও গ্রাম থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে পাঠানো হয় হবিগঞ্জের প্লান্টে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সংগ্রহ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হবে।
রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। কিছু পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১২টি দেশে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে উৎপাদনের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ‘গ্লোবাল রিসাইকেল স্ট্যান্ডার্ড (জিআরএস)’ সনদও অর্জন করেছে।
বর্তমানে প্রাণ-আরএফএল তাদের মোট প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রায় ১৫ শতাংশ রিসাইক্লিং করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৮০ হাজার টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে পিইটি বোতল, ব্যবহৃত টায়ার, ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং, বায়োডিগ্রেডেবল নন-ওভেন ব্যাগ উৎপাদন এবং পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক থেকে টেক্সটাইল শিল্পের জন্য সুতা তৈরির উদ্যোগ।
টেল প্লাস্টিকসের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, প্লাস্টিককে আর শুধু বর্জ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূল্যবান সম্পদ। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে রিসাইক্লিং শিল্পকে নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হলেও বাংলাদেশে সেই সহায়তা সীমিত। বর্তমানে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা এই শিল্পের বিকাশে বাধা তৈরি করছে।
দেশে বাড়ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার
দেশে বর্তমানে প্রায় চার হাজার প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০ লাখ মানুষ। দেশে প্রতিবছর প্লাস্টিক ব্যবহার হয় প্রায় ২৪ লাখ টন। মাথাপিছু ব্যবহারের পরিমাণ বছরে প্রায় ১৫ কেজি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নগরায়ণ যত বাড়বে, প্লাস্টিকের ব্যবহার তত বাড়বে। তাই এখনই কার্যকর রিসাইক্লিং অবকাঠামো গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে সংকট হবে ভয়াবহ।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, প্লাস্টিকের সঠিক সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু
এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
- বিষয় :
- প্লাস্টিক
