সেবা থেকে বঞ্চিত লক্ষাধিক চা শ্রমিক, হাসপাতাল খোলার দাবিতে মানববন্ধন
আলীনগর চা বাগানের ফ্যাক্টরি গেটে শত শত চা শ্রমিকের অংশগ্রহণে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ২১:৪৪ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ২১:৪৫
“চা শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতেই হবে”—এই স্লোগানে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শত শত চা শ্রমিক মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। শনিবার সকাল ৯টায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ক্যামেলিয়া হাসপাতাল দ্রুত চালুর দাবিতে উপজেলার আলীনগর চা বাগানের ফ্যাক্টরি গেটে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
শমশেরনগর, কানিহাটি, বাঘীছড়া, দেওছড়া ও ডাবলছড়া চা বাগানের বাগান পঞ্চায়েত, শ্রমিক, ছাত্র ও যুবকদের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে প্রায় হাজারো নারী-পুরুষ শ্রমিক অংশ নেন। ব্যানার ও স্লোগানে তারা দ্রুত হাসপাতালটি চালুর দাবি জানান।
শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েতের সভাপতি গনেশ পাত্রর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রামভজন কৈরি, সীতারাম বিন, নির্মল দাস পাইনকা, ইয়াকুব মিয়া, কিরন কুমার বৈদ্য, দিলিপ কৈরী এবং সজল কৈরি প্রমুখ।
শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েতের সভাপতি গনেশ পাত্রের সভাপতিত্বে এসময় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি, সাবেক ইউপি সদস্য ও শ্রমিক নেতা সীতারাম বিন, শিক্ষক ও শ্রমিক নেতা নির্মল দাস পাইনকা, শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াকুব মিয়া, ইউপি সদস্য কিরন কুমার বৈদ্য, রামবিরিচ কৈরি, গৌরি রানী কৈরী, কামারছড়া চা বাগানের সভাপতি দিলিপ কৈরী, যুবনেতা সজল কৈরি প্রমুখ।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দেওছড়া চা বাগানের সভাপতি শংকর রবিদাস, কানিহাটি চা বাগানের সভাপতি প্রতাপ রিকিয়াসন, বাঘীছড়া চা বাগানের সভাপতি লচমী রবিদাস এবং ভাবলছড়া চা বাগানের সভাপতি সঞ্জু তাঁতি প্রমুখ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ‘গত ২৬ মার্চ রাতে শমশেরনগর চা-বাগানের শ্রমিক বাবুল রবিদাসের ১৩ বছর বয়সী মেয়ে ঐশী রবিদাস অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটা অংশ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ওই ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়, যা এখনো চালু হয়নি।’
ক্যামেলিয়া হাসপাতাল বন্ধ থাকায় কমলগঞ্জ ও আশপাশের ৩৫টি চা বাগানের প্রায় এক লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। জরুরি চিকিৎসা, মাতৃসেবা, শিশু চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, ‘অধিকাংশ চা শ্রমিকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন না। ফলে সাধারণ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসূতি মায়েদের জটিলতা পর্যন্ত নানা সমস্যা নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘চা শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও অনিশ্চিত। হাসপাতালটি দ্রুত চালু না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
শ্রমিক নেতা সিতারাম বিন, নির্মল দাস পাইনকা ও ইউপি সদস্য ইয়াকুব মিয়া বলেন, ‘একটি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার। এটি বন্ধ থাকা মানে পুরো শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।’
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা শিল্প দেশের রপ্তানি আয় ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে এখনো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্যামেলিয়া হাসপাতাল পুনরায় চালু করা শুধু একটি হাসপাতাল খোলার বিষয় নয়, বরং হাজারো শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও।
