৭০% ক্লিনিকই অবৈধ, অভিযান নামমাত্র
কামরুল ইসলাম, নাটোর
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১৩:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাটোরে স্বাস্থ্য বিভাগের বৈধ সনদ ছাড়াই দেদার চলছে ১২৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। শহর থেকে উপজেলা—সবখানেই গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই নেই হালনাগাদ লাইসেন্স, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, দক্ষ নার্স কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। কোথাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে অস্ত্রোপচার, কোথাও ভুল রোগ নির্ণয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন রোগী।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগ নামমাত্র অভিযান চালায়। জরিমানার পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবার আগের মতোই শুরু হয় চিকিৎসার নামে বাণিজ্য। ফলে প্রতিদিনই অনিরাপদ চিকিৎসার মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই হালনাগাদ সনদ
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী বৈধ লাইসেন্স, নিবন্ধিত চিকিৎসক, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার সুযোগ নেই। বাস্তবে সেই নিয়মের বড় অংশই উপেক্ষিত হচ্ছে নাটোরে।
তথ্য অনুযায়ী, নাটোরে ১৭৮টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৭১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হালনাগাদ সনদ রয়েছে মাত্র ২৩টির। সিংড়ায় ৮টির মধ্যে ৩টি, গুরুদাসপুরে ২৪টির মধ্যে ৪টি, বড়াইগ্রামে ৩৭টির মধ্যে ৯টি, লালপুরে ২৪টির মধ্যে ৮টি, বাগাতিপাড়ায় ৬টির মধ্যে ৪টি এবং নলডাঙ্গায় ৮টির মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠানের সনদ হালনাগাদ রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, পুরো জেলার চিকিৎসাসেবা খাত কতটা নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা ঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন।
কাগজে সুযোগসুবিধা, বাস্তবে নেই
বাস্তব চিত্র দেখতে শহরের বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে প্রচণ্ড অব্যবস্থাপনা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সামনে লাইসেন্স নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ নেই। কোথাও নেই জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, পোস্ট অপারেটিভ রুম কিংবা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল। শহরের জনসেবা হাসপাতাল, পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রাইম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শেফা ক্লিনিক ও আস্থা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের ঘাটতি পাওয়া গেছে। কাগজপত্রে এসব সুবিধা দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নাটোর শাখার সদস্য সচিব ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম রোগীর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিএমএর হস্তক্ষেপ করার আইনি সুযোগ নেই।
ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার খতিয়ান
নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করায় জেলায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় মৃত্যুর ঘটনা। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি শহরের প্রাইম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সাবিহা খাতুনের সিজার অপারেশন হয়। তাঁর অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন। এ ঘটনায় পরে প্রতিষ্ঠানটি রোগীর স্বজনকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দায় সারে।
শহরের চকরামপুর এলাকার শিরিন আক্তারকে সিজারের জন্য গত ২৯ এপ্রিল ইসলামী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অপারেশনের তিন দিন পর ছাড়পত্র দিলে বাড়ি ফেরার পরেই তাঁর হাত-পা অবশ হতে শুরু করে। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় একই হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিরিন মারা যান। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসার অবহেলায় এই মৃত্যু। তবে ইসলামী হাসপাতালের পরিচালক আতিকুল ইসলাম রাসেল অবহেলার দায় অস্বীকার করে দাবি করেন, নিয়ম মেনেই তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
ছাড়পত্র নিয়েও প্রশ্ন
সনদ না থাকা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালকরা তাদের নিজস্ব যুক্তি তুলে ধরেন। জনসেবা হাসপাতালের রফিকুল ইসলাম, পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আশরাফুল ইসলাম, আস্থা ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের আরিফুল ইসলাম এবং একতা ক্লিনিকের ডা. মাজেদুর রহমান জানান, তারা প্রত্যেকেই লাইসেন্স হালনাগাদের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া কঠিন শর্তাবলি পূরণ করা এবং নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখনও চূড়ান্ত সনদ হাতে পাননি। তাদের দাবি, সরকারি দপ্তরের পক্ষ থেকে সনদ দিতে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ক্লিনিক পরিচালক অভিযোগ করে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে জটিলতা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। একই ধরনের আবেদন করেও কেউ ছাড়পত্র পান, কেউ পান না। ‘সমঝোতা’ করলে নিয়মের কঠোরতা শিথিল হয়ে যায়। তাদের দাবি, তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণাগারের শর্ত অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন না করেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র পেয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শর্ত পূরণ না করলে কাউকেই ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। যারা পেয়েছেন, তারা নিয়ম মেনেই পেয়েছেন।’
নামমাত্র অভিযান ও প্রশাসনের ভূমিকা
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০২৫ সালে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে মাত্র তিনটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সে সময় বিএমডিসি আইন অনুযায়ী তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত কোনো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বা কোনো প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার তথ্য সিভিল সার্জনের কাছে নেই।
এই স্থবিরতাকে ‘নামমাত্র তদারকি’ হিসেবে দেখছেন নাটোর সনাকের সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, নিয়মিত কঠোর মনিটরিং না থাকায় অবৈধ ক্লিনিকগুলো পার পেয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আব্দুল আওয়াল রাজা লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে নাটোর সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, ‘শর্ত না মানলে সনদ নবায়নের সুযোগ নেই। অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানাও করা হচ্ছে।’ তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তথ্য চাইলে তা দেখাতে পারেননি স্বাস্থ্যের এই কর্মকর্তা।
বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
